পুরোনো ল্যাপটপ স্লো কেন হয়, উইন্ডোজ রিইনস্টল ছাড়াই কম্পিউটার ফাস্ট করার সম্পূর্ণ পদ্ধতি

সকালে ল্যাপটপের পাওয়ার বাটন চেপে আপনি চা বানাতে গেলেন। ফিরে এসে দেখলেন স্ক্রিনে এখনও ঘুরন্ত ডট, ডেস্কটপ আসতে আরও এক মিনিট বাকি। যে মেশিনটা কেনার সময় পঁচিশ সেকেন্ডে চালু হত, সেটাই এখন চার মিনিট নেয়। Chrome খুলতে গেলে ফ্যান হঠাৎ প্লেনের মত শব্দ শুরু করে, আর তিনটা ট্যাব খুললেই মাউস কার্সর আটকে যায়।

এই অবস্থায় বেশিরভাগ মানুষ দুইটা কাজ করেন। কেউ সার্চ করে র‍্যান্ডম একটা ক্লিনার সফটওয়্যার নামিয়ে ফেলেন, কেউ দোকানে গিয়ে বলেন নতুন করে উইন্ডোজ দিয়ে দিন। দুইটার কোনটাই আসল সমাধান নয়, কারণ সমস্যাটা ঠিক কোথায় সেটাই এখনও নির্ণয় করা হয়নি। ডাক্তার যেমন পরীক্ষা ছাড়া ওষুধ দেন না, কম্পিউটারের ক্ষেত্রেও নিয়মটা একই।

এই টিউনে আমরা উল্টো পথে হাঁটব। আগে মাপব, তারপর ঠিক করব। প্রথমে জানব একটা মেশিন আসলে কেন স্লো হয়, তারপর ষাট সেকেন্ডে রোগ নির্ণয় করব, এরপর ছয়টা ধাপে ধরে ধরে ঠিক করব। শেষে দেখব কোন আপগ্রেডে আসলে টাকা দেওয়া যুক্তিযুক্ত, আর কোন জনপ্রিয় টিপসগুলো আপনার মেশিনের ক্ষতি করছে। একটা কথা শুরুতেই বলে রাখি, এখানে কোন থার্ড পার্টি ক্লিনার সফটওয়্যার নামাতে বলা হবে না।

➡ ল্যাপটপ পুরোনো হলে স্লো হয়, এই ধারণাটা আসলে অর্ধসত্য

একটা প্রসেসর বয়স বাড়ার সাথে ধীরে চলতে শুরু করে না। সিলিকনের ভেতরের ট্রানজিস্টর পাঁচ বছর পরেও প্রায় একই গতিতে সুইচ করে। তাহলে পাঁচ বছরের পুরোনো ল্যাপটপ স্লো লাগে কেন। কারণ মেশিন একই থেকেছে, কিন্তু তার উপর চাপানো কাজের ভার দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

হার্ডওয়্যার দুর্বল হয় না, চাহিদা বেড়ে যায়

যে সময় আপনি ল্যাপটপটা কিনেছিলেন, তখনকার একটা ওয়েবসাইট হয়ত দুই মেগাবাইট ডেটা আর সামান্য জাভাস্ক্রিপ্ট চালাত। এখন একই ধরনের সাইট অনেক বেশি স্ক্রিপ্ট, ট্র্যাকার আর ভিডিও নিয়ে আসে। ব্রাউজারের প্রতিটা ট্যাব এখন আলাদা প্রসেস হিসেবে চলে, প্রতিটা প্রসেস আলাদা করে RAM নেয়।

একই সাথে উইন্ডোজ নিজেও ভারী হয়েছে, ব্যাকগ্রাউন্ডে ইনডেক্সিং, সিঙ্ক, টেলিমেট্রি আর আপডেট সার্ভিস চলে। এর উপর বছরের পর বছর ইনস্টল করা সফটওয়্যারগুলো নিজেদের আপডেটার আর স্টার্টআপ এন্ট্রি রেখে গেছে। ফলে একই হার্ডওয়্যারের ঘাড়ে এখন অনেক বেশি বোঝা।

স্লো হওয়ার পেছনে মূল চারটি বটলনেক

  • Storage - ডিস্ক যদি ঘূর্ণায়মান HDD হয়, তবে সেটাই নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে প্রধান অপরাধী। HDD এর র‍্যান্ডম রিড অনেক ধীর, আর উইন্ডোজ চালু হওয়ার সময় ছোট ছোট হাজারটা ফাইল র‍্যান্ডম ভাবে পড়ে।
  • RAM - RAM ভরে গেলে উইন্ডোজ বাধ্য হয়ে ডেটা ডিস্কে সরিয়ে রাখে, একে Paging বলে। ডিস্ক RAM এর চেয়ে বহুগুণ ধীর, তাই তখন পুরো সিস্টেম আটকে যেতে থাকে।
  • CPU - কিছু নির্দিষ্ট কাজে যেমন ভিডিও এক্সপোর্ট বা কম্পাইল করায় প্রসেসর আসল সীমা। তবে সাধারণ ব্রাউজিং স্লো হলে CPU খুব কমই মূল কারণ।
  • Thermal - ভেতরে ধুলো জমে বাতাস চলাচল বন্ধ হলে প্রসেসর গরম হয়ে নিজের গতি নিজেই কমিয়ে দেয়। এটাকে Thermal Throttling বলে, আর এটা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত কারণ।

মজার ব্যাপার হল, মানুষ সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করে CPU নিয়ে ভাবতে, অথচ বাস্তবে Storage আর Thermal ঠিক করলেই সমস্যার সিংহভাগ চলে যায়।

➡ আগে রোগ নির্ণয়, ষাট সেকেন্ডে নিজের মেশিনকে পড়ে ফেলুন

কোন সেটিং বদলানোর আগে জানতে হবে বাধাটা কোথায়। এই পরীক্ষাগুলোর জন্য কিছু নামাতে হবে না, সবই উইন্ডোজের ভেতরেই আছে।

Task Manager দিয়ে আসল অপরাধী ধরা

  • কীবোর্ডে Ctrl, Shift ও Esc একসাথে চাপুন, সরাসরি Task Manager খুলবে।
  • Performance ট্যাবে যান, তারপর বাম দিকের তালিকা থেকে Disk নির্বাচন করুন। মেশিন স্লো থাকা অবস্থায় যদি Active Time শতভাগের কাছাকাছি আটকে থাকে, তবে আপনার বাধা ডিস্ক।
  • Memory নির্বাচন করুন। মোট RAM এর কত শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে দেখুন, আর নিচে Committed সংখ্যাটা লক্ষ করুন। Committed এর প্রথম সংখ্যা যদি আপনার মোট RAM ছাড়িয়ে যায়, তবে মেশিন Paging করছে।
  • Processes ট্যাবে গিয়ে Memory কলামের উপর ক্লিক করে সাজান। কোন অ্যাপ কত RAM খাচ্ছে পরিষ্কার দেখা যাবে।

Startup apps ও Last BIOS time পড়ার নিয়ম

Task Manager এর Startup apps ট্যাবে গেলে ডান দিকের উপরে Last BIOS time নামে একটা সংখ্যা দেখবেন। এটা উইন্ডোজ শুরু হওয়ার আগে হার্ডওয়্যার প্রস্তুত হতে যে সময় নেয়। সাধারণ ল্যাপটপে এটা তিন থেকে দশ সেকেন্ডের মধ্যে থাকে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ কলামটা হল Startup impact। High লেখা প্রতিটা এন্ট্রি আপনার বুট টাইম সরাসরি বাড়াচ্ছে। এই তালিকাটাই আমরা পরের ধাপে পরিষ্কার করব।

আপনার ড্রাইভ HDD না SSD, নিশ্চিত হওয়ার সহজ উপায়

  • Start বাটনে ডান ক্লিক করে Terminal অথবা Windows PowerShell খুলুন।
  • এই কমান্ডটি লিখে এন্টার দিন - Get-PhysicalDisk | Select FriendlyName, MediaType, HealthStatus
  • MediaType কলামে HDD লেখা থাকলে আপনার মেশিনে ঘূর্ণায়মান ডিস্ক আছে, SSD লেখা থাকলে সলিড স্টেট ড্রাইভ।
  • HealthStatus কলামে Healthy ছাড়া অন্য কিছু লেখা থাকলে ড্রাইভটির স্বাস্থ্য নিয়ে সতর্ক হতে হবে, তখন সবার আগে ব্যাকআপ নিন।

এই একটা কমান্ডের ফল দিয়েই আপনি বুঝে যাবেন বাকি পথটা কেমন হবে। MediaType যদি HDD দেখায়, তবে এই টিউনের সব সফটওয়্যার টিউনিং মিলিয়ে যা লাভ হবে, একটা SSD লাগালে তার চেয়ে বেশি লাভ হবে।

➡ ধাপ এক, স্টার্টআপ পরিষ্কার করে বুট টাইম অর্ধেকে আনা

উইন্ডোজ চালু হওয়ার সময় ডজন খানেক প্রোগ্রাম নিজে থেকে চালু হতে চায়। এদের বেশিরভাগই আপনার দরকার নেই, অথচ প্রত্যেকে ডিস্ক আর RAM এর ভাগ নিয়ে যায়।

কোনগুলো বন্ধ করা নিরাপদ

  • Settings খুলে Apps এ যান, তারপর Startup নির্বাচন করুন। এখানে সব স্টার্টআপ এন্ট্রি টগল সহ পাওয়া যাবে।
  • Spotify, Steam, Discord, Zoom, Skype, Adobe Updater, Java Updater জাতীয় এন্ট্রি নির্ভয়ে বন্ধ করুন। দরকার হলে আপনি নিজে খুলে নেবেন।
  • প্রিন্টার, স্ক্যানার আর মোবাইল কোম্পানির সঙ্গী সফটওয়্যারগুলোর স্টার্টআপ এন্ট্রি বন্ধ করুন, ডিভাইস তবুও কাজ করবে।
  • OneDrive যদি আপনি সত্যিই ব্যবহার করেন তবে রাখুন, না করলে বন্ধ করুন। এটা ব্যাকগ্রাউন্ডে অনেক ডিস্ক কাজ করে।

কোনগুলোতে হাত দেবেন না

  • Realtek বা অন্য অডিও ম্যানেজার, কারণ বন্ধ করলে সাউন্ড কন্ট্রোল হারাতে পারেন।
  • টাচপ্যাড ও গ্রাফিক্স ড্রাইভারের এন্ট্রি, এগুলো হার্ডওয়্যারের সাথে সরাসরি জড়িত।
  • আপনার ব্যবহৃত অ্যান্টিভাইরাস, নিরাপত্তার জন্য এটা চালু থাকা জরুরি।
  • নাম দেখে চিনতে না পারলে সেটা রেখে দিন, আগে নামটা সার্চ করে জেনে নিন তারপর সিদ্ধান্ত নিন।

স্টার্টআপ ছাড়াও ব্যাকগ্রাউন্ড অনুমতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। Settings এ Apps খুলে Installed apps এ যান, যে অ্যাপটি নিয়ে সন্দেহ সেটির তিন ডট থেকে Advanced options খুলুন, তারপর Background apps permissions এ Never নির্বাচন করুন। মেইল বা মেসেজিং অ্যাপে এটা করলে নোটিফিকেশন দেরিতে আসবে, তাই বেছে বেছে করুন।

➡ ধাপ দুই, স্টোরেজ খালি করা ও Storage Sense কে কাজে লাগানো

সি ড্রাইভ যখন প্রায় ভরে যায়, উইন্ডোজ আর স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে পারে না। কারণ তার অস্থায়ী ফাইল, আপডেট আর Paging এর জন্য জায়গা দরকার। একটা সাধারণ নিয়ম মনে রাখুন, সি ড্রাইভে অন্তত পনেরো শতাংশ জায়গা সব সময় খালি রাখুন।

নিরাপদে জায়গা খালি করার ধাপ

  • Settings খুলে System এ যান, তারপর Storage নির্বাচন করুন। উইন্ডোজ নিজেই ভাগ করে দেখাবে কোন ধরনের ফাইল কত জায়গা নিয়েছে।
  • Temporary files এ ক্লিক করুন। এখান থেকে Windows Update Cleanup, Delivery Optimization Files, Thumbnails ও Temporary Internet Files নির্ভয়ে মুছতে পারেন।
  • Downloads ঘরটির চেকবক্সে টিক দেওয়ার আগে দুইবার ভাবুন, কারণ আপনার দরকারি ফাইলও ওখানে থাকতে পারে।
  • Recycle Bin খালি করুন, তবে নিশ্চিত হয়ে নিন ভেতরে দরকারি কিছু নেই।
  • একই পাতায় Storage Sense চালু করুন। এটা চালু থাকলে উইন্ডোজ নিজেই নিয়ম করে অস্থায়ী ফাইল আর পুরোনো Recycle Bin পরিষ্কার রাখবে।

বড় ফাইল কোথায় লুকিয়ে আছে

একই Storage পাতার নিচে Show more categories এ ক্লিক করলে Other নামের একটা ভাগ পাবেন। সেখান থেকে ফোল্ডার ধরে ধরে দেখতে পারবেন কোন ফোল্ডার সবচেয়ে বেশি জায়গা খেয়েছে। বেশিরভাগ ল্যাপটপে অপরাধী তিনটা জিনিস, পুরোনো ভিডিও, WhatsApp ও Messenger এর ডেস্কটপ ক্যাশ, আর অনেকগুলো আধা ডাউনলোড করা সেটআপ ফাইল।

যদি ল্যাপটপে দুইটা ড্রাইভ থাকে, তবে ডকুমেন্ট, ছবি আর ভিডিওর ফোল্ডারগুলো ডি ড্রাইভে সরিয়ে নিন। এতে সি ড্রাইভ হালকা থাকবে আর ভবিষ্যতে উইন্ডোজ রিসেট করলেও আপনার ফাইল আলাদা থাকবে।

➡ ধাপ তিন, ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট ও পাওয়ার সেটিংস ঠিক করা

উইন্ডোজের অ্যানিমেশন আর কাঁচের মত ট্রান্সপারেন্সি দেখতে সুন্দর, কিন্তু পুরোনো ইন্টিগ্রেটেড গ্রাফিক্সে এগুলো প্রতিটা ক্লিকে বাড়তি কাজ যোগ করে। এগুলো কমালে মেশিনের গতি না বাড়লেও প্রতিক্রিয়া অনেক দ্রুত মনে হয়, আর ব্যবহারকারীর কাছে সেটাই আসল অনুভূতি।

  • Start এর পাশের সার্চে View advanced system settings লিখে খুলুন, তারপর Advanced ট্যাবের Performance ঘরের Settings বাটনে ক্লিক করুন।
  • Adjust for best performance নির্বাচন করলে সব ইফেক্ট বন্ধ হবে। একটু ভালো দেখতে চাইলে Custom নির্বাচন করে শুধু Smooth edges of screen fonts আর Show thumbnails instead of icons টিক দিয়ে রাখুন।
  • Settings এ Accessibility খুলে Visual effects এ যান, সেখানে Transparency effects আর Animation effects বন্ধ করুন।
  • Settings এ System খুলে Power & battery তে যান, Power mode এ Best performance নির্বাচন করুন। ল্যাপটপ চার্জারে লাগানো থাকলে এটা কাজে দেয়, ব্যাটারিতে চললে ব্যাটারি দ্রুত শেষ হবে।

➡ ধাপ চার, ব্রাউজার, যেখানে RAM এর আসল খরচ হচ্ছে

সত্যি কথাটা হল, বেশিরভাগ মানুষের ল্যাপটপ উইন্ডোজের কারণে স্লো নয়, ব্রাউজারের কারণে স্লো। আট গিগাবাইট RAM এর একটা মেশিনে বিশটা ট্যাব খোলা থাকলে আর দশটা এক্সটেনশন চালু থাকলে সেই মেশিনের আটকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

  • Chrome এ Settings খুলে Performance এ যান, Memory Saver চালু করুন। এতে যে ট্যাবগুলো আপনি দেখছেন না সেগুলো ঘুমিয়ে পড়ে আর RAM ছেড়ে দেয়।
  • Extensions এর তালিকা খুলে একবার সৎ ভাবে দেখুন। গত এক মাসে যেটা ব্যবহার করেননি, সেটা রাখার কোন কারণ নেই।
  • একই কাজের জন্য দুইটা ব্রাউজার চালু রাখবেন না। Chrome আর Edge একসাথে খোলা থাকলে RAM দুই ভাগ হয়ে যায়।
  • পরে পড়ার জন্য ট্যাব খুলে রাখার অভ্যাসটা বদলে ফেলুন, বুকমার্ক করে ট্যাব বন্ধ করে দিন।

এখানে একটা হিসাব মনে রাখলে সুবিধা হয়। প্রতিটা সাধারণ ট্যাব প্রায় পঞ্চাশ থেকে দুইশ মেগাবাইট RAM নিতে পারে, ভিডিও বা ভারী ওয়েব অ্যাপ হলে আরও বেশি। তাই বিশটা ট্যাব মানে অনেক সময় দুই থেকে তিন গিগাবাইট RAM, যেটা আট গিগাবাইটের মেশিনের জন্য বড় ধাক্কা।

➡ ধাপ পাঁচ, উইন্ডোজের নিজের ফাইল মেরামত ও ড্রাইভার হালনাগাদ

অনেক সময় স্লো হওয়ার কারণ কোন অ্যাপ নয়, বরং উইন্ডোজের নিজের কিছু সিস্টেম ফাইল নষ্ট হয়ে যাওয়া। এতে সার্চ কাজ করে না, সেটিংস খুলতে দেরি হয়, বা কোন সার্ভিস বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে CPU খেতে থাকে। এর জন্য উইন্ডোজে দুইটা তৈরি করা টুল আছে।

  • Start এ ডান ক্লিক করে Terminal (Admin) খুলুন। অনুমতি চাইলে Yes দিন।
  • প্রথমে লিখুন sfc /scannow আর এন্টার দিন। এটা সিস্টেম ফাইল মিলিয়ে দেখে নষ্ট ফাইল ঠিক করে, সময় নেয় দশ থেকে ত্রিশ মিনিট।
  • এরপর লিখুন DISM /Online /Cleanup-Image /RestoreHealth আর এন্টার দিন। এটা উইন্ডোজের মূল ইমেজটাই মেরামত করে।
  • দুইটা শেষ হলে মেশিন রিস্টার্ট দিন।

ড্রাইভারের ব্যাপারে একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। ড্রাইভার আপডেট করার জন্য কোন থার্ড পার্টি Driver Updater সফটওয়্যার নামাবেন না, ওগুলো প্রায়ই ভুল ড্রাইভার বসিয়ে সমস্যা বাড়ায়। বরং Settings এ Windows Update খুলে Advanced options এ যান, তারপর Optional updates দেখুন, ড্রাইভার থাকলে ওখানেই পাবেন। গ্রাফিক্স ড্রাইভার দরকার হলে সরাসরি Intel, AMD বা NVIDIA এর নিজের সাইট থেকে নামান।

➡ ধাপ ছয়, তাপ ও Thermal Throttling, সবচেয়ে অবহেলিত কারণ

এই ধাপটা বাকি সবগুলোর চেয়ে বেশি ফল দিতে পারে, অথচ এটা নিয়ে সবচেয়ে কম আলোচনা হয়। প্রসেসর যখন নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তখন সে নিজেকে বাঁচাতে নিজের ঘড়ির গতি অনেক নিচে নামিয়ে দেয়। ফলে কাগজে কলমে দ্রুত একটা প্রসেসর বাস্তবে অর্ধেক গতিতে চলতে থাকে।

কীভাবে বুঝবেন তাপ সমস্যা হচ্ছে

  • ল্যাপটপ চালু করার প্রথম কয়েক মিনিট বেশ দ্রুত চলে, তারপর হঠাৎ ধীর হয়ে যায়।
  • ভারী কাজ শুরু করলে ফ্যান অনেক জোরে চলে, আর কীবোর্ডের বাম দিক গরম হয়ে ওঠে।
  • ভিডিও কলে বা গেমে কিছুক্ষণ পর ফ্রেম আটকে আটকে যায়।

কী করবেন

  • ল্যাপটপ কখনও বিছানা, বালিশ বা কোলে রেখে ভারী কাজ করবেন না। নিচের বাতাস টানার ফাঁকগুলো বন্ধ হয়ে গেলে ভেতরে গরম বাতাস আটকে থাকে।
  • শক্ত ও সমান টেবিলে রাখুন, পেছনের দিকে সামান্য উঁচু করে দিলে বাতাস চলাচল ভালো হয়।
  • দুই তিন বছর ধরে সার্ভিসিং না হলে ভেতরের হিটসিংক আর ফ্যানে ধুলোর পুরো আস্তরণ জমে যায়। অভিজ্ঞ কারও কাছে ভেতরটা পরিষ্কার করান।
  • Thermal Paste অনেক পুরোনো হলে সেটা বদলানো দরকার। এটা নিজে না করে সার্ভিস সেন্টারে করানো ভালো, কারণ ভুল হলে হিটসিংক ঠিক ভাবে বসে না।

একটা ধুলোভরা তিন বছরের ল্যাপটপ পরিষ্কার করার পর অনেক সময় এমন সাড়া দেয় যে মালিক ভাবেন নতুন উইন্ডোজ দেওয়া হয়েছে। অথচ কোন সফটওয়্যারে হাতই দেওয়া হয়নি।

➡ কোন আপগ্রেডে টাকা দেওয়া যুক্তিযুক্ত

সফটওয়্যার টিউনিংয়ের একটা সীমা আছে। সেই সীমার পর আসল লাফটা আসে হার্ডওয়্যার থেকে। কিন্তু সব আপগ্রেড সমান ফল দেয় না, তাই অগ্রাধিকারটা জানা দরকার।

এক নম্বর, SSD

যদি এখনও HDD চলে, তবে SSD লাগানোই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। বুট টাইম প্রায়ই তিন থেকে চার মিনিট থেকে বিশ সেকেন্ডের ঘরে নামে, অ্যাপ খোলার অপেক্ষা প্রায় শেষ হয়ে যায়। খরচের তুলনায় এর ফল অন্য যেকোন আপগ্রেডের চেয়ে বেশি।

দুই নম্বর, RAM

আট গিগাবাইট থেকে ষোল গিগাবাইটে যাওয়া তখনই যুক্তিযুক্ত, যখন Task Manager এ দেখেছেন স্বাভাবিক কাজেই Memory প্রায় পূর্ণ থাকে। মনে রাখবেন RAM বাড়ালে মেশিন দ্রুত হয় না, বরং একসাথে বেশি কাজ চালানোর সামর্থ্য বাড়ে। কেনার আগে ল্যাপটপের মডেল দেখে নিশ্চিত হয়ে নিন কোন ধরনের RAM লাগে আর খালি স্লট আছে কি না।

তিন নম্বর, ব্যাটারি ও পাওয়ার

ব্যাটারি অনেক দুর্বল হয়ে গেলে কিছু ল্যাপটপ নিজে থেকেই পারফরম্যান্স কমিয়ে দেয়, কারণ ব্যাটারি চাহিদা মত বিদ্যুৎ দিতে পারে না। এই বিষয়টা নিয়ে বিস্তারিত জানার আগে বুঝে নিন আপনার ব্যাটারির অবস্থা আসলে কী।

➡ যেগুলো করবেন না, জনপ্রিয় কিন্তু ক্ষতিকর সাতটি কাজ

ইন্টারনেটে পিসি ফাস্ট করার নামে এমন অনেক পরামর্শ ঘোরে যেগুলো হয় অর্থহীন, নয়ত ক্ষতিকর। এই তালিকাটা মনে রাখলে অনেক ভোগান্তি বাঁচবে।

  • Registry Cleaner ব্যবহার করা। রেজিস্ট্রির অকেজো এন্ট্রি মুছলে মাপার মত কোন গতি বাড়ে না, বরং ভুল কিছু মুছে গেলে অ্যাপ বা উইন্ডোজ নষ্ট হতে পারে।
  • RAM Booster বা One Tap Boost জাতীয় টুল চালানো। এগুলো জোর করে RAM খালি করে, অথচ খালি RAM এর কোন মূল্য নেই। ফলে অ্যাপগুলো আবার শূন্য থেকে লোড হয় আর মেশিন উল্টো ধীর হয়।
  • System Configuration এ গিয়ে Number of processors বদলানো। এটা বুট দ্রুত করে না, বরং ভুল মান বসালে বুট সমস্যা তৈরি করতে পারে।
  • SSD কে Defragment করা। SSD তে ফাইলের ভৌত অবস্থান কোন ব্যাপার নয়, আর বাড়তি লেখালেখি ড্রাইভের আয়ু কমায়। উইন্ডোজ নিজেই SSD এর জন্য ঠিক কাজটা করে।
  • গতি বাড়াতে Windows Defender বা Windows Update বন্ধ করে রাখা। যে সামান্য গতি পাবেন তার বিনিময়ে মেশিনকে অরক্ষিত করে ফেলছেন।
  • একসাথে দুইটা অ্যান্টিভাইরাস চালানো। এরা একে অন্যের ফাইল স্ক্যান করতে থাকে, ফলে ডিস্ক আর CPU দুইটাই অকারণে ব্যস্ত থাকে।
  • Lite বা Super Lite নামের কাটাছেঁড়া করা পাইরেটেড উইন্ডোজ বসানো। এগুলোতে নিরাপত্তার অংশ বাদ দেওয়া থাকে, আপডেট আসে না, আর কী কী যোগ করা আছে তা কেউ জানে না।

আরেকটা কথা, Pagefile পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শও অনেক জায়গায় দেখবেন। এটা করলে RAM ভরে গেলে অ্যাপ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটা উইন্ডোজের নিজের ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়াই সবচেয়ে ভালো।

➡ আপনি যদি এখনও Windows 10 চালান

বাংলাদেশে এখনও প্রচুর ল্যাপটপ Windows 10 এ চলছে, তাই এই অংশটা আলাদা করে জানা দরকার। Windows 10 এর নিয়মিত সাপোর্ট শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর। এরপর মাইক্রোসফট সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য একটা বাড়তি নিরাপত্তা আপডেটের ব্যবস্থা রেখেছে, যার নাম Extended Security Updates।

  • এই বাড়তি সুরক্ষার সময়সীমা এখন ২০২৭ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, অর্থাৎ হাতে সময় আছে কিন্তু অসীম নয়।
  • এটা শুধু নিরাপত্তা আপডেট, নতুন ফিচার বা পূর্ণ সাপোর্ট নয়।
  • আপনার মেশিন Windows 11 নিতে পারবে কি না তা জানতে Settings এ Windows Update খুলে দেখুন, যোগ্য হলে ওখানেই প্রস্তাব দেখাবে।
  • বর্তমানে Windows 11 এর স্টেবল সংস্করণ 25H2, আর পরের বড় হালনাগাদটি নিয়ে কাজ চলছে।

একটা বিষয়ে সতর্ক থাকুন। পুরোনো ও দুর্বল হার্ডওয়্যারে জোর করে Windows 11 বসালে অনেক সময় মেশিন আগের চেয়ে ধীর লাগে। তাই আগে এই টিউনের ধাপগুলো শেষ করুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।

➡ শেষ উপায়, রিইনস্টল ছাড়াই উইন্ডোজ মেরামত

সব ধাপ শেষ করেও যদি সমস্যা থাকে, তবে সবকিছু মুছে নতুন উইন্ডোজ দেওয়ার আগে আরও দুইটা ধাপ আছে।

  • Settings এ System খুলে Recovery তে যান। সেখানে Fix problems using Windows Update নামের অপশনটি আপনার ফাইল, অ্যাপ আর সেটিংস রেখেই উইন্ডোজের সিস্টেম অংশটা আবার বসিয়ে দেয়।
  • এতেও না হলে একই Recovery পাতায় Reset this PC আছে। সেখানে Keep my files নির্বাচন করলে আপনার ব্যক্তিগত ফাইল থাকবে, তবে ইনস্টল করা সফটওয়্যার মুছে যাবে।

এই দুইটার কোনটা করার আগেই ব্যাকআপ নিন, ব্যতিক্রম নেই। বাইরের একটা হার্ডডিস্কে দরকারি ফোল্ডারগুলো কপি করে রাখুন, আর কাজটা যদি নিয়ম করে স্বয়ংক্রিয় ভাবে করতে চান তবে উইন্ডোজের নিজের টুল দিয়েই সেটা সম্ভব।

➡ সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

ক্লিনার সফটওয়্যার ছাড়া সত্যিই পিসি ফাস্ট করা যায়

যায়, এবং সেটাই সঠিক পথ। উপরের প্রতিটা কাজ উইন্ডোজের নিজের সেটিংস দিয়েই করা হয়েছে। যেসব ক্লিনার নিজেদের বিজ্ঞাপণে বড় সংখ্যা দেখায়, তারা মূলত অস্থায়ী ফাইল মুছে সেই জায়গাকেই সাফল্য হিসেবে দেখায়, যেটা উইন্ডোজ নিজেই বিনামূল্যে করে দেয়।

আট গিগাবাইট RAM এখন কি কম

সাধারণ ব্রাউজিং, ডকুমেন্ট আর ভিডিও দেখার জন্য আট গিগাবাইট এখনও চলে, যদি আপনি ট্যাবের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখেন। কিন্তু ভিডিও এডিটিং, ভার্চুয়াল মেশিন বা একসাথে অনেক ভারী অ্যাপ চালাতে চাইলে ষোল গিগাবাইট দরকার হবে।

প্রতি মাসে উইন্ডোজ দেওয়া কি ভালো অভ্যাস

না, এটা অপ্রয়োজনীয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবার নতুন করে উইন্ডোজ দেওয়া মানে প্রতিবার আপনার ডেটা হারানোর সুযোগ তৈরি করা। ভালো ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা একটা উইন্ডোজ কয়েক বছর নির্ভরযোগ্য ভাবে চলতে পারে।

Disk Cleanup ও Storage Sense এর মধ্যে কোনটা ভালো

দুইটার কাজ কাছাকাছি, তবে Storage Sense আধুনিক এবং স্বয়ংক্রিয়। একবার চালু করে দিলে আপনাকে আর মনে রাখতে হয় না, তাই দৈনন্দিন ব্যবহারে এটাই বেশি কাজের।

SSD লাগালে কি পুরোনো উইন্ডোজ আবার বসাতে হবে

দুইটা পথই আছে। পুরোনো ড্রাইভ থেকে ক্লোন করে নেওয়া যায়, আবার নতুন করে উইন্ডোজ বসিয়ে ডেটা কপি করে নেওয়া যায়। নতুন করে বসানো একটু বেশি সময় নেয়, তবে ফল সাধারণত বেশি পরিষ্কার হয়।

➡ শেষ কথা

একটা স্লো ল্যাপটপ প্রায় কখনও একটা কারণে স্লো হয় না। ভরা স্টোরেজ, বারোটা স্টার্টআপ অ্যাপ, ধুলোভরা ফ্যান আর কুড়িটা ব্রাউজার ট্যাব মিলে একসাথে গলা চেপে ধরে। ভালো খবর হল, এই চারটার প্রতিটাই আপনি আজ বিকেলেই ঠিক করে ফেলতে পারেন, একটা টাকাও খরচ না করে।

আপনার কাছে অনুরোধ, উপরের ধাপগুলো শুরু করার আগে Task Manager এর Startup apps ট্যাব খুলে Last BIOS time এর সংখ্যাটা আর High লেখা এন্ট্রির সংখ্যাটা একবার দেখে নিন। তারপর ধাপগুলো শেষ করে আবার দেখুন।

টিউমেন্টে শুধু দুইটা সংখ্যা লিখে জানান, আপনার Last BIOS time কত ছিল আর High লেখা স্টার্টআপ এন্ট্রি কয়টা পেয়েছেন। আর আপনার ড্রাইভ HDD না SSD সেটাও লিখে দিন, আমি বলে দিতে পারব আপনার ক্ষেত্রে কোন ধাপটা সবচেয়ে বেশি কাজে দেবে।

সৌজন্যে: উইন্ডোজে Robocopy ও Task Scheduler দিয়ে অটোমেটিক ফাইল ব্যাকআপ সিস্টেম তৈরির পদ্ধতি | ফোনের ব্যাটারি হেলথ কেন দ্রুত কমে যায় ও ব্যাটারির আয়ু বাড়ানোর উপায় | ফোনের স্টোরেজ ভরে যায় কেন ও নিরাপদে জায়গা খালি করার পদ্ধতি | মোবাইল ডেটা এত দ্রুত শেষ হয় কেন ও MB বাঁচানোর সম্পূর্ণ পদ্ধতি

Level 1

আমি নাছিরুল হক। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 3 দিন 11 ঘন্টা যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 23 টি টিউন ও 3 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 2 টিউনারকে ফলো করি।

আমি নাছিরুল হক। প্রোগ্রামিং আর প্রযুক্তি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালোবাসি। টেকটিউনসে মূলত Java প্রোগ্রামিং নিয়ে ধাপে ধাপে হাতে কলমে টিউটোরিয়াল লিখি — JDK ইনস্টল ও এনভায়রনমেন্ট সেটআপ থেকে শুরু করে IntelliJ IDEA, Exception Handling, OOP, Java Swing ও ফাইল হ্যান্ডলিং পর্যন্ত। এছাড়া স্মার্টফোন, ব্যাটারি ও নেটওয়ার্ক নিয়ে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যামূলক...


টিউনস


আরও টিউনস


টিউনারের আরও টিউনস


টিউমেন্টস