
আমরা যারা প্রতিদিন প্রযুক্তির সাথে যুক্ত থেকে কাজ করি কিংবা সাধারণ ব্যবহারকারী হিসেবে প্রযুক্তির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করি, আমাদের সবার মনেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI নিয়ে এক চমৎকার স্বপ্ন ও রঙিন আশা তৈরি হয়েছিল। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে আমাদের বলে আসছেন যে, আধুনিক AI Tools ও অটোমেশন আমাদের কর্মজীবনের কঠিন চাপ কমিয়ে দেবে, জটিল কাজগুলোকে নিমিষেই সমাধান করবে এবং আমাদের উপহার দেবে বহু প্রতীক্ষিত মানসিক প্রশান্তি আর কিছুটা বাড়তি Free Time।
কিন্তু বাস্তব জীবনের কর্পোরেট চিত্রটি কি আসলেই সাধারণ মানুষের এই সহজ প্রত্যাশার সাথে মিলছে?
বাস্তবতা হলো, আপনি যদি ভেবে থাকেন যে প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন আপনার কর্মঘণ্টা কমিয়ে আপনাকে বেশি অবসর এনে দেবে, তবে সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বার্তা আপনার চোখ খুলে দেবে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট Meta-র শীর্ষ মহল থেকে আসা কিছু খোলামেলা বক্তব্য পুরো বিশ্বজুড়ে Employee Wellness বনাম কোম্পানির উচ্চাভিলাষী AI Goals নিয়ে এক বিশাল ও তীব্র Debate বা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনাটির সূচনা হয়েছিল Meta-র অভ্যন্তরে আয়োজিত একটি খোলামেলা কর্মীদের সমাবেশ বা Employee Event-এ। সেখানে উপস্থিত শীর্ষ নেতৃত্বের মুখোমুখি হয়ে এক সাধারণ কর্মী অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী একটি প্রশ্ন তোলেন।
তিনি জানতে চান—বর্তমানে AI যেভাবে কর্মীদের কাজের গতি অবিশ্বাস্য রকম বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সামগ্রিক Work-কে নাটকীয়ভাবে অনেক বেশি Productive করে তুলছে, তার সুফল হিসেবে কর্মীরা কি আগের চেয়ে কিছুটা বেশি Free Time বা ছুটির সুযোগ পাওয়ার আশা করতে পারেন?
এই প্রশ্নের পেছনে একটি বড় পটভূমি ছিল। বৈশ্বিক মহামারীর সময়ে অর্থাৎ সেই Pandemic Days-এর দিনগুলোতে যখন ঘরবন্দী অবস্থায় কর্মীদের মানসিক চাপ চরমে উঠেছিল, তখন বিশ্বজুড়ে মানুষের Health এবং Wellness-কে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। কর্মীরা এখনও সেই দিনগুলোর প্রতি এক ধরনের গভীর Nostalgia বা স্মৃতিকাতরতা অনুভব করেন। সেই সংকটময় সময়ে কর্মীদের কাজের মানসিক চাপ ও ক্লান্তি বা Burnout প্রতিরোধ করার জন্য Meta একটি চমৎকার Company-Wide Perk চালু করেছিল, যার নাম ছিল Meta Days। এই বিশেষ সুবিধার আওতায় প্রত্যেক কর্মী প্রতি Year-এ ৩ থেকে ৪টি বাড়তি Days পেতেন, যা তারা সাধারণ ছুটির সাথে বা Weekends-এর সাথে যুক্ত করে মানসিক প্রশান্তি ও পারিবারিক সময় উপভোগ করতে পারতেন।
কিন্তু কর্মীদের সেই নস্টালজিয়া ও প্রত্যাশাকে এক মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিয়ে Meta-র CTO (Chief Technology Officer) Andrew Bosworth অত্যন্ত রূঢ় ও স্পষ্ট ভাষায় তাঁর চূড়ান্ত অবস্থান জানিয়ে দেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, Company কোনো পরিস্থিতিতেই এই Meta Days পুনরায় ফিরিয়ে আনবে না।
একদম সরাসরি ও ক্ষোভের সুরে Bosworth কর্মীদের উদ্দেশে বলে ওঠেন:
"Stop Asking about Meta Days. It's Very Dumb."
অর্থাৎ, ছুটির জন্য এমন দাবি তোলাকে তিনি পুরোপুরি চরম নির্বুদ্ধিতা বলে অভিহিত করেন।
CTO শুধু ছুটির বিরোধিতাই করেননি, বরং তিনি এর চেয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে পুরো কর্মসংস্কৃতির জন্য এক কঠোর নির্দেশনা জারি করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, AI ব্যবহারের ফলে কর্মীদের যে বাড়তি Time Savings বা সময় সাশ্রয় হবে, তা কোনোভাবেই ব্যক্তিগত Work Hours কমানোর পেছনে ব্যবহার করা যাবে না।
বরং সেই বেঁচে যাওয়া বাড়তি সময় পুরোপুরি বিনিয়োগ করতে হবে Meta-র বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি কোটি Users-দের জন্য আরও নতুন, দারুণ, আকর্ষণীয় এবং উন্নত Features ও Stuff তৈরির পেছনে।
নিজের ব্যক্তিগত কাজের অভ্যাসের উদাহরণ টেনে তিনি খোলামেলাভাবে প্রকাশ করেন:
"I Get An Extra Hour. You Know What I Do with It? I Put It into That."
অর্থাৎ, কাজের ক্ষেত্রে তিনি নিজে যখনই আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় বাড়তি একটি Hour বাঁচিয়ে নিতে পারেন, তখন তিনি সেই বাড়তি সময়কে বিশ্রাম না দিয়ে বরং নতুন কিছু তৈরির কাজে পুনরায় বিনিয়োগ করেন। কর্মীদের কাছ থেকেও তিনি হুবহু একই ধরনের কাজের সংস্কৃতি ও মানসিকতা প্রত্যাশা করছেন।

আলোচনা যখন আরও গভীরে প্রবেশ করে, তখন Andrew Bosworth-এর কথা বলার ধরন কার্যত একজন কড়া মেজাজের School-Principal-এর রূপ ধারণ করে। তাঁর পুরো আচরণে এমন এক কর্তৃত্বপরায়ণ Manner ফুটে ওঠে, যা দেখে মনে হচ্ছিল—কর্মীরা যদি নিজেদের জন্য বাড়তি সুযোগ-সুবিধা বা অতিরিক্ত Perks চাওয়ার ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে যায়, তবে তাদের জন্য চূড়ান্ত জবাব বা Answer হতে পারে সরাসরি প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার বা Expulsion।
কর্মীদের ওপর বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি পারিবারিক এক উপমা টেনে বলেন:
"Go to Your Parents And Ask Them: Hey, Like Every Time I Get A Chance to Talk to My Boss, Ask Me If I Can Have More Days Off."
অর্থাৎ, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে একজন দায়িত্বশীল কর্মীর পক্ষে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলার সুযোগ পেলেই ছুটির দাবি তোলা কতটা অশোভন ও অর্থহীন এক আচরণ।
তবে এমন আগ্রাসী বক্তব্যের পরপরই পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠলে Bosworth কিছুটা কৌশলী অবস্থান নেন। তিনি পরবর্তীতে স্বীকার করেন যে, তিনি হয়তো কর্মীদের প্রতি একটু বেশিই কঠোর হয়েছিলেন। একই সাথে তিনি পুরো বিষয়টি লঘু করার চেষ্টা করে দাবি করেন যে, তাঁর পুরো বক্তব্যটি ছিল আসলে নিছকই এক ধরনের রসিকতা বা Tongue-in-Cheek।
তবে তিনি মুখে যাই বলুন না কেন, তাঁর এই কৌশলী অবস্থান পরিবর্তনের ফলে পুরো পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি পুরোপুরি ঘুরে যায়। কোম্পানির সামগ্রিক অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি বা Economics-এর জায়গা থেকে সম্পূর্ণ Focus সরিয়ে তিনি পুরো দায়ভার এক ঝটকায় কর্মীদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর চাপিয়ে দেন।

এই পুরো বিতর্কের পেছনে রয়েছে এক গভীর এবং অস্বস্তিকর বাস্তবতা। এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন মুহূর্তে ঘটেনি; বরং এটি এমন এক নাজুক সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে যখন Meta তাদের দীর্ঘমেয়াদী এবং অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী AI Strategy বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিপুল সংখ্যক কর্মী ও বিশাল Swaths-কে গণছাঁটাইয়ের মাধ্যমে বিদায় করে দিচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও নাটকীয় রূপ ধারণ করেছে একটি বড় আইনি মামলার কারণে। একদল প্রাক্তন কর্মী Unfair Dismissal বা অন্যায্য বরখাস্তের অভিযোগ এনে সরাসরি Meta-র বিরুদ্ধে আদালতে একটি Lawsuit দায়ের করেছেন।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে এক চমকপ্রদ তথ্য—Meta তাদের নিজস্ব তৈরি Muse Spark AI Model নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার সাহায্য নিয়েছিল কর্মীদের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের জন্য।
সেই AI Model অভ্যন্তরীণ ডেটা বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত নির্মমভাবে একটি স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনশীলতার তালিকা বা Productivity List তৈরি করে। আর সেই স্বয়ংক্রিয় তালিকার ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটি ২৬ জন কর্মীকে একযোগে চাকরিচ্যুত করে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সেই বরখাস্ত হওয়া ২৬ জন মানুষের মধ্যে এমন কর্মীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা কোম্পানির নিয়মনীতি পুরোপুরি মেনেই বিভিন্ন ধরনের মাতৃত্বকালীন ছুটি, অসুস্থতাজনিত ছুটি কিংবা জরুরি ব্যক্তিগত অনুমোদিত Leave ভোগ করছিলেন।
এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, কর্পোরেট দুনিয়ায় যখন মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সরাসরি অ্যালগরিদমের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন তা কতটা অমানবিক রূপ নিতে পারে এবং কর্মক্ষেত্রে মানসিক প্রশান্তির বিষয়টি কতটা বড় হুমকির মুখে পড়ে।

বর্তমানে প্রযুক্তি বিশ্বে শীর্ষ কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের যে অন্ধ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাতে সাধারণ মানবিক আবেদনগুলো পুরোপুরি চাপা পড়ে যাচ্ছে। Meta এই মুহূর্তে নিজেদের পুরো শক্তি নিয়ে তথাকথিত AI Revolution-এর চালকের আসনে বসার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই তারা আগামী September মাসেই বাজারে নিজেদের তৈরি নিজস্ব প্রসেসর বা AI Chip উৎপাদনের বিশাল Plans ও প্রস্তুতি ঘোষণা করেছে।
যখন শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বড় বড় কর্মকর্তারা এবং সিলিকন ভ্যালির উচ্চপদস্থ High-Flyers-রা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গতির সাথে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজের ধরন ও Habits-এর তুলনা করতে শুরু করেছেন, তখন কর্পোরেট নজরদারির সংজ্ঞাও বদলে গেছে। সংবাদপত্রের শিরোনামে আগে যেখানে শুধুই সাধারণ লাভ-লোকসানের খবর বা সাধারণ Headlines গুরুত্ব পেত, সেখানে এখন শীর্ষ Leaders-রা সম্পূর্ণ মনোযোগ স্থানান্তর করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাপেক্ষে মানুষের কাজের গতি মাপার বিশেষ ধরনের Human-Performance Metrics পর্যবেক্ষণের দিকে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মানুষের কাজের ভবিষ্যৎ কেমন হতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যান্য প্রভাবশালীদের ভাবনাও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন OpenAI-এর CEO Sam Altman এক বক্তব্যে উল্লেখ করেছিলেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজ কেড়ে নিয়ে সবাইকে অলস করে রাখবে না; বরং AI মানুষকে আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি কর্মব্যস্ত বা Busier করে তুলবে। এর সাথে তিনি অত্যন্ত প্রত্যয়ের সাথে যোগ করেছিলেন যে, কর্মীরা এই বাড়তি কাজের চাপে থেকেও আসলে আনন্দিত ও সন্তুষ্টই থাকবে।

Meta-র শীর্ষ কর্মকর্তার এই কঠোর বার্তা প্রযুক্তি দুনিয়ায় এক গভীর দার্শনিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি স্পষ্ট করে তুলেছে যে, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে যে অভাবনীয় উৎপাদনশীলতার অতিরিক্ত সুবিধা বা Productivity Gains অর্জিত হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত কার ঘরে যাবে—তা নিয়ে দুই পক্ষের মাঝে প্রবল টানাপোড়েন বা Tensions বিরাজ করছে।
সবশেষে এটিই অত্যন্ত স্পষ্ট যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত উন্নতই হোক না কেন, আধুনিক কর্পোরেট কাঠামোর ভেতরে বাড়তি উৎপাদনশীলতার ফল সরাসরি কর্মীদের ব্যক্তিগত ছুটির তালিকায় রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে; বরং সেই সাশ্রয় হওয়া প্রতি সেকেন্ডকে নতুন নতুন প্রকল্পে রূপান্তর করে কর্মীদের আরও বেশি ব্যস্ত রাখাই এখন আগামী দিনের কর্পোরেট বাস্তবতা।
-
টেকটিউনস টেকবুম
আমি টেকটিউনস টেকবুম। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 13 বছর যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 1353 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 3 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।