
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি বাজারে এখন এক নজিরবিহীন অস্থিরতা বিরাজ করছে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মেমোরি বা র্যাম এবং এসএসডির দাম আকাশছোঁয়া। তবে এখন এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু এই দুটি যন্ত্রাংশেই সীমাবদ্ধ নেই; গ্রাফিক্স কার্ড, মাদারবোর্ড, ম্যাকবুক, আইফোন, অ্যান্ড্রয়েড ফোন থেকে শুরু করে গেমিং কনসোল—সবকিছুর দামই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কোনো পণ্যের দাম আগের তুলনায় দুই থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রযুক্তিপ্রেমী থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী, যারা একটি ল্যাপটপ বা কম্পিউটার কিনতে বাজারে যাচ্ছেন, তাদের প্রতিনিয়তই এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিপ্লবের এই যুগে সাধারণ গেমার বা প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের জন্য বর্তমান সময়টিকে সবচেয়ে কঠিন সময় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হার্ডওয়্যার বা মেমোরি মার্কেটে এই অস্থিতিশীলতার পেছনে মূলত কাজ করছে গুটিকয়েক বড় কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্য। বর্তমানে মেমোরি মার্কেটের প্রায় ৯০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে স্যামসাং (Samsung), মাইক্রন (Micron) এবং এসকে হাইনিক্সের (SK Hynix) মতো মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান। বাজারে সরবরাহ সংকট ও দাম বৃদ্ধির সুযোগে এই কোম্পানিগুলো রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা অর্জন করছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বিপুল লাভের পরও বিনিয়োগকারীরা সন্তুষ্ট নন; তারা চাইছেন লাভের পরিমাণ যেন আরও বাড়ানো হয়। আগামী বাজার পরিস্থিতি নিয়েও খুব একটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। স্যামসাং এবং এসকে হাইনিক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, এই সাপ্লাই চেইন সংকট বা শর্টেজ ২০২৭ সাল, এমনকি ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২০২৭ সাল পর্যন্ত তাদের র্যাম উৎপাদনের পুরো ক্ষমতা (ক্যাপাসিটি) ইতিমধ্যেই বুকিং হয়ে আছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে প্রযুক্তি পণ্যের দাম কমার কোনো সম্ভাবনা তো নেই-ই, বরং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
তবে এই তিন পরাশক্তির একচেটিয়া রাজত্বে (Triopoly) কিছুটা হলেও কাঁপন ধরিয়েছে চিনের চ্যাংক্সিন মেমোরি টেকনোলজিস (CXMT) নামের একটি সেমিকন্ডাক্টর প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সালে ডিডিআর-৪ (DDR4) র্যাম তৈরির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা এই কোম্পানি বর্তমানে ডিডিআর-৫ (DDR5) উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য দেখাচ্ছে। শুরুর দিকে তাদের উৎপাদিত র্যামের মান নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন থাকলেও (তখন সফল উৎপাদনের হার বা Yield রেট ছিল মাত্র ৫০ শতাংশ), বর্তমানে তা চমৎকারভাবে ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তাদের র্যামের স্পিডও এখন ৯০০০ মেগাট্রান্সফার পার সেকেন্ড (MT/s) স্পর্শ করেছে। ফলস্বরূপ এইচপি (HP) ও আসুসের (Asus) মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো এখন সিএক্সএমটি-এর মেমোরি ব্যবহারের জন্য সারিবদ্ধ হচ্ছে। এমনকি শাওমি (Xiaomi) তাদের আসন্ন ফ্ল্যাগশিপ ফোল্ডেবল ফোনের জন্য সর্বাধুনিক এলপিডিডিআর-৬ (LPDDR6) মেমোরি এই সিএক্সএমটি থেকেই সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে তাদের শেয়ার ৩ শতাংশ থেকে এক লাফে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারকে নতুন করে বাধাগ্রস্ত করছে। চিনা সামরিক বাহিনীর সাথে গোপন যোগসাজশের অভিযোগ এনে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই সিএক্সএমটিকে তাদের বাজারে নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের দিক থেকে সেমিকন্ডাক্টর দুনিয়ার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি (TSMC) আরও একধাপ এগিয়ে ১.৬ ন্যানোমিটারের চিপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই নতুন চিপ তাদের আগের ২ ন্যানোমিটার চিপের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং ২০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ খরচ করে। কিন্তু প্রযুক্তি সামনের দিকে এগোলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি এবং নতুন করে আরোপ হতে যাওয়া বিভিন্ন মার্কিন শুল্ক বা ট্যারিফের কারণে হার্ডওয়্যারের সামগ্রিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
বাজারের এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় ও সরাসরি ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতা ও শিক্ষার্থীরা। একসময় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে একটি বেশ ভালো মানের ল্যাপটপ পাওয়া যেত, যা এখন বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় ঠেকেছে। শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০ হাজার টাকার বাজেটের ল্যাপটপগুলো বাজার থেকে প্রায় হারিয়েই গেছে। বর্তমানে এই বাজেটে যে ল্যাপটপগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোতে ৬-৭ বছরের পুরনো জেনারেশনের প্রসেসর ব্যবহার করে চটকদার 'নতুন লঞ্চ' তকমা দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। এমনকি ডেস্কটপ পিসির সাধারণ কোনো একটি পার্টস আপগ্রেড করতে গেলেও ক্রেতাদের এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বর্তমান এই সংকটময় বাস্তবতায় প্রযুক্তি পণ্যের আগের দামের কথা ভেবে বসে থাকলে চলবে না। সরবরাহ সংকট, গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে গ্লোবাল হার্ডওয়্যার ক্রাইসিসের এই চরম মুহূর্তে ক্রেতাদের বাধ্য হয়েই বাড়তি দামে নিজেদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি পণ্যটি কিনে নিতে হচ্ছে।
আমি নাজমুল ইসলাম আবির। Senior Executive, Digital Marketing & eSports, GIGA-BYTE Technology Co., Ltd., Dhaka, Bangladesh। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 5 বছর 3 মাস যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 11 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।