
কয়েক বছর আগেও কেউ কি ভেবেছিল, হাতের মুঠোয় ছোট্ট একটা যন্ত্র দিয়ে গোটা পৃথিবীটা চষে ফেলা যাবে? উফফ, সত্যি বলতে কি, প্রযুক্তি যে আজ আমাদের জীবনের প্রতিটি কোণে গেঁথে গেছে, সেটা অস্বীকার করার জো নেই। আর এই যে যন্ত্র, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এরা এসেছে বলে আমাদের জীবনটা কি সত্যিই সুন্দর হয়েছে, নাকি আরও জটিল? এই প্রশ্নটা আজকাল অনেকেই করে। আমার তো মনে হয়, উত্তরটা মোটেও সোজা নয়।
দেখুন, প্রযুক্তির সুবিধাগুলো নিয়ে কথা বললে তালিকাটা অনেক লম্বা হবে। এক নম্বরেই আসবে যোগাযোগ। আহা, ভাবুন তো! মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে থাকা প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলা, ভিডিও কলে দেখা করা, ছবি পাঠানো – এসব আগে ছিল নিছকই কল্পনা। এখন তো পান্তা ভাতের মতো সহজ। প্রবাসী ছেলেটা মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারছে রোজ, দূরে থাকা বন্ধুটা জন্মদিনে উইশ করছে লাইভ। এটা কি কম পাওয়া? মোটেই না। এই সুবিধাটা মানসিক শান্তি এনে দেয়, সম্পর্কগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে।
শিক্ষা! এটার কথা না বললেই নয়। যখন ইচ্ছে তখনই বিশ্বের সেরা সেরা লাইব্রেরির বই পড়া যাচ্ছে, নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার শোনা যাচ্ছে, নতুন নতুন ভাষা শেখা যাচ্ছে। কোভিডের সময়টা কি আমরা ভুলে গেছি? স্কুল-কলেজ সব বন্ধ, অথচ পড়াশোনা কিন্তু থামেনি। প্রযুক্তিই বাঁচিয়েছিল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে। ঘরে বসেই ক্লাস করা, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়া – এটা তো এক বিশাল বিপ্লব। আর হ্যাঁ, ঘরে বসেই নতুন কিছু শেখার সুযোগ, যেমন অনলাইন কোর্স বা কর্মশালা, যা আগে শুধু বড় শহরের বিত্তবানদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল, আজ তা সবার জন্য উন্মুক্ত।
তারপর ধরুন স্বাস্থ্যসেবার কথা। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয়, আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি – সব কিছুতেই প্রযুক্তির ছোঁয়া। দূর থেকে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, জরুরি তথ্য আদান-প্রদান করা, এমনকি জটিল অপারেশনও এখন প্রযুক্তির সাহায্যেই সম্ভব হচ্ছে। এসব দেখে মনে হয়, জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তির অবদান সত্যিই অবিশ্বাস্য।
অর্থনীতি আর ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা তো বলতেই হয়। অনলাইন কেনাকাটা, ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং – এসবই প্রযুক্তির কল্যাণ। একজন তরুণ তার ঘরে বসেই বিদেশের ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করতে পারছে, নিজের একটা ছোট দোকানকে বানিয়ে ফেলছে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলেছে। ব্যাংক থেকে টাকা তোলা বা পাঠানো, বিল পরিশোধ করা – এসবই এখন সেকেন্ডের ব্যাপার। লাইনে দাঁড়ানোর দিন ফুরিয়েছে, তাতে সময় বাঁচে, ঝক্কি কমে।
এত গেল সুবিধার কথা। কিন্তু ভাই, মুদ্রার উল্টো পিঠটাও তো দেখতে হবে, নাকি? প্রযুক্তির অসুবিধাও কিন্তু কম না, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক।
প্রথমেই আসে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন। আপনি অনলাইনে কী করছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কী দেখছেন – এসব ডেটা কি সত্যিই সুরক্ষিত? নাকি কোনো বড় কোম্পানি বা হ্যাকার আপনার অজান্তেই সব তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে? সাইবার হামলা, ডেটা চুরি – এসব ঘটনা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনটা যেন একটা খোলা বই হয়ে যাচ্ছে, যা খুব ভয়ংকর। এই যে ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট, এটা তো একরকম নজরদারি। সত্যি বলতে কি, আমাদের অজান্তেই আমরা বিশাল একটা ডেটাবেসের অংশ হয়ে যাচ্ছি।
আর একটা সমস্যা হলো আসক্তি। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গেম – এগুলোতে এতটাই ডুবে যাচ্ছি যে বাস্তব জীবনটাই ভুলতে বসেছি। একটা বাচ্চা ল্যাপটপে গেম খেলতে খেলতে কখন যে দিন পার করে ফেলছে, তার হুঁশ নেই। বড়রাও রেহাই পাচ্ছে না। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে ঘুমানো পর্যন্ত, চোখটা আটকে থাকে স্ক্রিনে। এর ফল কী? চোখের সমস্যা, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ আর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। আড্ডাবাজির বদলে এখন সবাই ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাই না? এটা কি স্বাস্থ্যকর? আমার তো মনে হয় না।
কর্মসংস্থান হারানোটাও একটা বড় বিষয়। রোবট আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে হারে কাজ করছে, তাতে অনেক মানুষের কাজ হারানোর ভয় বাড়ছে। আগে যে কাজ মানুষ করত, এখন যন্ত্র সেটা করে দিচ্ছে কম সময়ে, কম খরচে। এটা কি আখেরে ভালো হবে, নাকি সমাজে বেকারত্ব বাড়াবে? এই প্রশ্নটা কিন্তু বেশ জোরালো।
আরেকটা জিনিস যা আমাকে বেশ ভাবায়, তা হলো তথ্যের ভুল ব্যবহার বা ভুয়া খবর ছড়ানো। ইন্টারনেট সুবিধার পাশাপাশি এই মিথ্যা তথ্যের বিষও ছড়াচ্ছে দ্রুত। গুজব, বিদ্বেষমূলক টিউন – এগুলো সমাজে অস্থিরতা তৈরি করছে, ভুল বোঝাবুঝি বাড়াচ্ছে। একটা মিথ্যা খবর মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়, আর তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যা – এই পার্থক্য করাটাই আজকাল কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও কিন্তু প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা – এগুলোর কারণে ঘাড় ব্যথা, কোমর ব্যথা, চোখের সমস্যা আর স্থূলতা বাড়ছে। শিশুদের মধ্যে এসব সমস্যা আরও বেশি প্রকট। তাদের খেলাধুলার সময় কমে যাচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে স্ক্রিন টাইম।
শেষমেশ যদি বলি, প্রযুক্তি নিজে কিন্তু ভালো বা মন্দ নয়। এটা একটা হাতিয়ার। সেটার ব্যবহার কীভাবে হবে, সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আমাদের ওপর। একটা ছুরি দিয়ে যেমন জীবন বাঁচানো যায়, তেমনই জীবন কেড়েও নেওয়া যায়। প্রযুক্তিও তাই। আমরা যদি সচেতনভাবে, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এর ব্যবহার করি, তাহলে এর থেকে অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে। আর যদি লাগামহীনভাবে ব্যবহার করি, তাহলে এর কুফল ভোগ করতে হবে। বিষয়টা আমাদের হাতেই।
আসুন, আমরা নিজেরা একটু ভাবি। প্রযুক্তির সুবিধাগুলো নিই, কিন্তু তার দাস না হয়ে পড়ি। নিজেদের জীবনটা কি শুধু ডিজিটাল স্ক্রিনে আটকে রাখার জন্য? নাকি জীবনের আসল আনন্দগুলো উপভোগ করার জন্য? উত্তরটা আপনার কাছেই।
নতুন বই আসতে চলেছে! আপনার জীবনের জটিল সম্পর্কের সব জট খুলতে আসছে এক দারুণ বই।
বই: "হে পুরুষ, শোনো সম্পর্কের সেইসব কথা, যা কেউ বলেনি!"
লেখক: আমির হোসেন
যোগাযোগ করুন: আমির হোসেন
আমি আমির হোসেন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 6 মাস 4 সপ্তাহ যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 5 টি টিউন ও 3 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 1 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 5 টিউনারকে ফলো করি।
বই পড়া খুব পছন্দ আমার ।