একটা মেয়ের গল্প💔 🥀

হ্যালো everyone, কেমন আছেন সবাই? আশাকরি ভালো আছেন। আজকের লেখাটা একটু অন্যরকম হবে। আজকে আমি আপনাদের একটা মেয়ের সম্পর্কে জানাব। হ্যাঁ, একটা মেয়ে, এই গল্পটা যেই মেয়েটার তার নাম রুহি।

নামটা রেখেছিল তার বাবা। তারপরিবারে ৪ জন মানুষ—তার বাবা, মা, ছোট ভাই আর তার দাদু। মেয়েটা বাংলাদেশের একটা গ্রামে মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাংলাদেশের গ্রামগুলো না, কেমন একটা। এখানে মেয়েদের ১৪ বছর পার হলেই মানুষ মেয়েটাকে বিয়ের উপযুক্ত মনে করে, মনে করে ১৮ বা ১৯ বছর বয়সের মধ্যে তাকে বিয়ে দিতে না পারলে সেই মেয়েটা বুড়ো হয়ে যায়। পরে আর তার বিয়ে হয় না। কিন্তু এই নিষ্ঠুর সমাজে এই মেয়েটা জন্ম নিয়েছিল অনেক বড়ো স্বপ্ন নিয়ে আর এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় ভুল।

মেয়েটার যখন ৪ বছর বয়স, তখন তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। বলা ভালো, সে যেই স্কুলে পড়ত সেই স্কুলেই তার বাবা পিয়নের চাকরি করত। ছোট্ট একটা চাকরি—স্কুলের ওয়াশরুম পরিষ্কার করা, স্কুলের ক্লাসরুমগুলো পরিষ্কার করা, এই সব ছিল তার কাজ। মেয়েটা জন্ম নিয়েছিল একটা গরিব পরিবারে। তার মা যদিও বড়লোক একটা পরিবারের মেয়ে ছিল, কিন্তু তারপরও তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ ছিল। তার বাবা-মার বিয়েটা কিন্তু পারিবারিক ভাবেই হয়েছিল, কিন্তু কে জানত এত বড়ো আর ধনী ব্যক্তির মেয়ের এত গরিব ঘরে বিয়ে হবে। এটাই ছিল সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা।

মেয়েটার বাবা যখন একটু ঘুরে দাঁড়াবে, তখন তার চাচা তাদের আলাদা করে দেয়। মেয়েটার বাবা নিজের সংসার চালানোর জন্য একদিকে স্কুলে কাজ করত, অন্যদিকে সেলাই দোকানে সেলাই করত। এত অভাবের মধ্যে বড় হতে হতে, নিজের বাবা-মায়ের কষ্ট দেখতে দেখতে মেয়েটা একদম ছোট্ট থেকে তার মাথায় একটা কথা গেঁথে যায়: “আমি একদিন বড় হব, অনেক বড় চাকরি করব। বাবাকে আর কষ্ট করতে দেব না। ”

এই কথাটা ভেবেই মেয়েটা পুরো দমে পড়ালেখা চালিয়ে দেয়। সে সব সময় ভালো করার চেষ্টা করত, পরীক্ষার রেজাল্টও ভালো আসত। তাছাড়া মেয়েটা টাকার জন্য এতটাই পাগল হয়ে গিয়েছিল যে সে মাত্র ক্লাস ৪-৫-এ থাকাকালীন সময় থেকে একটা ইনকাম সোর্স খুঁজছিল। সে অনলাইনে অনেক ভিডিও দেখত—বিভিন্ন অ্যাপে গেম খেলে টাকা ইনকামের ভিডিও। কিন্তু আফসোস, এই সমাজে সবাই প্রতারক। এই সমাজে সব কিছুই মিথ্যে, সে কোনো কিছুই পায়নি, কোনো এমন অ্যাপ পায়নি, কোনো চাকরির উৎস পায়নি। অবশ্য এত ছোটো একটা মেয়েকে চাকরি কে দেবে?! তারপরও মেয়েটা হাল ছাড়ল না, সে এই সংগ্রাম চালিয়ে গেল।

যত দিন যায়, মেয়েটা বড়ো হয়। এক দিন, দুই দিন এভাবে করে ১ বছর, ২ বছর কেটে যায়। মেয়েটা বড় হয়। আর সাথে বুঝতে পারে আসলে তার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে কারণ যেই বাবা-মাকে সুখে রাখার জন্য সে এসব করতে চেয়েছিল তাদের কাছে সে বোঝা হয়ে গিয়েছিল। যদিও তার বাবা এতদিনে খুব ভালো একটা চাকরি করেছে, তার বাবা বিদেশ থাকে, তাদের একটা সুন্দর বাড়িও করেছে—তারপরও তার বাবা-মায়ের কাছে সে একটা বোঝা হয়ে পড়ে। আর এটা সে বোঝে মাত্র ১০ বছর বয়সে কারণ ঐ যে বললাম, এই সমাজের লোকগুলো মেয়েদের ১৪ বছর বয়সেই বিয়ের উপযুক্ত মনে করে। কিন্তু মেয়েটা ছিল কালো, আর তার ১৪-১৫ বছর হতে যে আর বেশি দেরি নেই, তাই তার বাবা-মা চিন্তিত হয়ে পড়ল। তখন থেকেই তার আশেপাশের মানুষ তার সামনেই এসব নিয়ে কথা বলা শুরু করল। তারা বলতে শুরু করল, “তুই যে এত কালো, তোকে বিয়ে করবে কে? আল্লাই জানে! তোর বাবা-মাকে তো অনেক যৌতুক দিতে হবে। ”

কথাগুলো মেয়েটার বুকে এসে লাগত, কিন্তু তারপরও সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করত। সে এটা মনে করত, “অন্যদের কথা দিয়ে কিছুই হবে না, আমি পড়ালেখায় ভালো, তাছাড়া আমার বাবার সামর্থ আছে আমাকে পড়ালেখা করানোর। তাদের কথায় কিছুই হবে না, আমার পরিবার আমার সাথে আছে। ”

কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। তার বাবা-মায়ের আচরণ তাকে সব কিছু বলে দিল। তার যখন ১১-১২ বছর বয়স তখন তার বাবার কথায় তার মা তাকে ফর্সা হওয়ার জন্য ক্রিম ব্যবহার করতে বলে। মেয়েটাও কোনো উপায় না পেয়ে ব্যবহার করা শুরু করে। এসব কিছুর কারণে মেয়েটার ত্বক খারাপ হতে শুরু করে, সে সূর্যের আলোয় যেতে পারে না। তার ত্বক জ্বালা-পোড়া করে, কিন্তু আফসোস তার বাবা-মা আর এই সমাজের মানুষের এতে কিছুই আসে যায় না, তারা শুধু চায় এই বোঝাটা বিয়ে দিয়ে বিদায় করতে। এই সময় একটা মেয়ের মনের অবস্থা যে কী হয় তা শুধু সেই জানে।

যাই হোক মেয়েটা যত বড়ো হতে লাগল, তার বাবা-মাও যেন পাগল হয়ে গেল। আশেপাশের মানুষগুলোও যেন কীরকম একটা হয়ে গেল। মেয়েটার বাবা-মা তাকে একটা, দুইটা করে অনেকগুলো ফর্সা হওয়ার ক্রিম ব্যবহার করতে বাধ্য করল, কিন্তু কোনো লাভ হল না। তার গায়ের রংটা যেন তাকে সবার সামনে হাসির পাত্র বানানোর জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই ক্রিমগুলো ব্যবহার করতে গিয়ে মেয়েটার অনেক হেনস্তা হতে হয়। একটা ভুল ক্রিম লাগিয়ে তার হাতের আর মুখের রং একদম ভিন্ন হয়ে যায়। তার মুখ, তার ত্বক একদম পাতলা হয়ে যায়। মেয়েটা তখন হাই স্কুলে পড়ে। আর এটার কারণে তাকে বুলির শিকার হতে হয়, সবাই তাকে বলতে থাকে সে কি ফর্সা হওয়ার জন্য ক্রিম ব্যবহার করেছে—যদিও কথাটা সত্যি কিন্তু এটা শোনা যে কতটা কষ্টের তা শুধু সেই মেয়েটার মতো মানুষগুলোই বুঝতে পারবে। তার এক টিচার তার স্কুলের ভরা মানুষের সামনে তাকে বলে, “যেই ক্রিমটা মুখে ব্যবহার করেছিস, সেটা হাতেও ব্যবহার কর। না হলে পরে সমস্যা হবে। ”

একটা মেয়েকে, এতগুলো মানুষ, এতগুলো অভিভাবক, এতগুলো স্টুডেন্ট—সবার সামনে এই কথাটা বলে সেই টিচারটা কত খুশি হয়েছে জানি না। তবে সেদিন সেই মেয়েটা অনেক কেঁদেছিল। সে তার মাকে এসে বলেছিল, “মা, আমি আর এসব ব্যবহার করব না। আমি আমার মতো থাকতে পছন্দ করি। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও। ” কিন্তু তার মা পুরো ঘটনাটা শুনে উল্টো তাকেই বকা দিল। তার উপরই সব দোষ দিল। আর সেই দিনই তারা তাদের মেয়েকে অজান্তেই ভেতর থেকে মেরে ফেলেছিল। মাত্র ১৪ বছর বয়সে।

এতক্ষণ যার কথা বলছিলাম, সে অন্য কেউ নয় বরং আমি নিজেই। আমি আমার বাবা-মা আর এই দেশের সমাজকে একটা কথা বলতে চাই, “আমি আপনাদের সবাইকে ঘৃণা করি, খুব ঘৃণা করি। ”

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমি আবার আমার বাবা-মাকে খুব ভালোওবাসি। আসলে এই অনুভূতিটা না খুব খারাপ—যখন আপনি কাউকে ঘৃণা করেন আবার ভালোওবাসেন। আপনি না তাকে কিছু বলতে পারেন, না তার ব্যবহার আপনার সহ্য হয়। আমি আমার মা-বাবাকে বলতে চাই, “আচ্ছা মা-বাবা, তোমরা আমাকে কেন মেনে নিতে পারছ না বলো তো! তোমাদের মনে কি একবারও এ স্বপ্নটা জাগে না? যে আমার মেয়ে একদিন অনেক বড়ো হবে, অনেক বড়ো চাকরি করবে। জানো বাবা, আমার না নিজের এই কালো চেহারাটাই ভালো লাগে। আমি আমার মতো থাকতে চাই। তোমরা বুঝতে চাও না কেন বলো তো?”

আসলে আমি শুধু আমার বাবা-মা নয়, এই সমাজের সবার কথাই বলছি। আপনারা যারা আমার লেখাটা পড়ছেন তাদেরও হয়তো খারাপ লাগছে কিন্তু সত্য কথা হলো আপনি নিজেও এই একই জিনিসটা হয়তো আপনার মেয়ের সাথে করছেন বা করবেন। আমি এই সমাজের সব মানুষদের একটা কথা বলতে চাই, যদি নিজের মেয়েকে তার মতো করে মেনে নিতে না পারেন, তাহলে জন্মের পরই গলা টিপে মেরে ফেলবেন।

ধন্যবাদ

Level 1

আমি শাজেদা আক্তার। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 1 সপ্তাহ 5 দিন যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 15 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 1 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।


টিউনস


আরও টিউনস


টিউনারের আরও টিউনস


টিউমেন্টস