চলুন ঘুরে আসি বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহের ভেতর থেকে!

টিউন বিভাগ মহাকাশ প্রযুক্তি
প্রকাশিত
জোসস করেছেন
Level 1
এসএসসি ২০২২, খায়রুল্লাহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

এই চারটি গ্রহ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রথমে আমাদের Gas Giant এবং Ice Giant– এই দুইটি বিষয় সম্পর্কে একটু জেনে নিতে হবে।

Gas Giant হচ্ছে সে সকল গ্রহ যাদের ঘনত্ব খুবই কম এবং যা প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে তৈরি। বৃহস্পতি (Jupiter), শনি (Saturn), ইউরেনাস (Uranus), নেপচুন (Neptune) – এই গ্রহগুলোকে গ্যাস জায়ান্ট (গ্যাস দৈত্য) বলা হয়। মূলত গ্যাস দিয়ে এ গ্রহগুলো তৈরি হওয়ায় এদেরকে এই নামে ডাকা হয়।

Ice Giant হচ্ছে এমন গ্রহ যা সূর্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করায় খুব বেশি ঠান্ডা হয়ে থাকে এবং যেটি হাইড্রোজেন এবং হিলিয়ামের চেয়ে ভারী উপাদান যেমন অক্সিজেন, কার্বন, নাইট্রোজেন এবং সালফার দ্বারা গঠিত হয়। ইউরেনাস এবং নেপচুন গ্রহকে আইস জায়ান্ট বলা হয়।

বৃহস্পতি ও শনি গ্রহ হলো শুধু গ্যাস জায়ান্ট। অন্যদিকে, ইউরেনাস এবং নেপচুন একইসাথে গ্যাস জায়ান্ট এবং আইস জায়ান্ট।

এ চারটি গ্রহ সম্পর্কে আমরা এখন জানব।

১. বৃহস্পতি গ্রহ (Jupiter)

১. সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহটির নাম বৃহস্পতি। এটি এত বড় যে, এর মধ্যে ১৩০০ টি পৃথিবী সুন্দরভাবে এঁটে যাবে।

২. পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব ৫৮ কোটি কিলোমিটার।

৩. এটি একইসাথে সৌরজগতের সবচেয়ে পুরনো গ্রহ।

৪. সৌরজগতের অন্যান্য সকল গ্রহের ভর যোগ করলেও এ গ্রহটির ভর তা থেকে ২.৫ গুণ বেশি হবে। তবে এর ভর সূর্যের ভরের ১/১০০০ (এক হাজার ভাগের এক ভাগ) অংশ।

৫. এর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি খুব শক্তিশালী এবং তার সাথে সাথে গ্রহটির চৌম্বক ক্ষেত্র বা Magnetic Field টিও দারুন শক্তিশালী।

৬. পৃথিবীর আকাশ থেকে চাঁদ এবং শুক্র গ্রহের পর বৃহস্পতি গ্রহকে সবচেয়ে উজ্জ্বল দেখায়।

৭. রাডার টেলিস্কোপের মাধ্যমে বৃহস্পতি গ্রহকে দেখা যায় না। গ্যাস দিয়ে তৈরি হওয়ায় এমনটা ঘটে। তবে গ্রহটির উপগ্রহগুলোকে দেখা যায়।

৮. এ গ্রহের ১ দিন = ৯ ঘন্টা ৫৬ মিনিট এবং ১ বছর = ৪৩২৯ দিন।

৯. গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৭৫% হাইড্রোজেন, ২৪% হিলিয়াম এবং বাকি ১% অন্যান্য গ্যাস রয়েছে।

১০. বৃহস্পতি গ্রহের ৮০ টির মতো প্রাকৃতিক উপগ্রহ আছে বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ৪ টি হলোঃ আইও, ইউরোপা, গ্যানিমেড এবং ক্যালিস্টো। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় চাঁদ হলো গ্যানিমেড। একইসাথে এটি সৌরজগতের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ।

১১. বৃহস্পতির সার্ফেসে রয়েছে লাল রঙের গোলাকার একটি দাগ। যাকে 'The Great Red Spot' বলা হয়। এটা আসলে একটা সাইক্লোন যা বিগত ৩৫০ বছর যাবৎ বয়ে চলেছে। এ দাগটি ছাড়াও অসংখ্য লাল রঙের দাগ রয়েছে বৃহস্পতি গ্রহে।

২. শনি গ্রহ (Saturn)

১. সৌরজগতের ২য় বৃহত্তম গ্রহ। এর মধ্যে মোট ৭৬৪ টি পৃথিবী ভালোভাবে ঢুকে যেতে পারবে।

২. সূর্য থেকে ৬ষ্ঠ স্থানে অবস্থান করছে।

৩. পৃথিবী থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে। তার ব্যাস রেখা পৃথিবীর ব্যাস রেখা থেকে ৯ গুণ বড় এবং আয়তন ৯৫ গুণ বেশি।

৪. বৃহস্পতির পর এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস জায়ান্ট।

৫. চকচকে একটি গ্রহ হওয়ায় টেলিস্কোপের সাহায্যেই দেখা যায়।

৬. গ্রহটিতে এ পর্যন্ত ৪ টি স্পেস মিশন চালানো হয়েছে(২০১৯ সাল পর্যন্ত)– পায়োনিয়ার-১১, ভয়েজার-১, ভয়েজার-২ এবং ক্যসিনি মিশন। এর মধ্যে ক্যাসিনি মিশনে শনি গ্রহকে সবচেয়ে কাছ থেকে অরবিট করা গেছে।

৭. শনি গ্রহের দুটি উপগ্রহ হলো- Enceledus এবং Titan (এ গ্রহের সবচেয়ে বড় চাঁদ)।

৮. গ্রহটির নাম রাখা হয়েছে রোমানের গড অফ এগ্রিকালচারের নামে।

৯. এটি সৌরজগতের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ গ্রহ কারণ এর রয়েছে একটি মোটা চওড়া বলয় বা রিং। তা ৭ ভাগে বিভক্ত-A, B, C, D, F, G এবং E। রিংটি তৈরি হয়েছে ছোট ছোট কিছু বরফের এবং পাথরের টুকরো দিয়ে।

১০. এ গ্রহটিতে দাঁড়িয়ে থাকার মতো কোনো সাপোর্ট নেই যেহেতু এখানে কঠিন পদার্থ পাওয়া যায় না।

১১. টেলিস্কোপের সাহায্যে পৃথিবী থেকে শনি গ্রহকে তার রিংসহ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

১২. রাতের আকাশে খালি চোখেই এটি দেখা যায় বলে অনেক আগেই গ্রহটির আবিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। প্রাচীনকালের বিভিন্ন পুঁথিতে Saturn বা শনি গ্রহের উল্লেখ আছে। যেমন-রোমান, ব্যবিলন, গ্রিক এমনকি ভারতীয় প্রাচীন ইতিহাসেও গ্রহটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১৩. টেলিস্কোপের আবিষ্কার ও বিকাশের সময়কালে (১৪০০-১৮০০) প্রথমবারের মতো শনি গ্রহকে তার প্রকৃত আকৃতিতে দেখা যায়।

১৪. শনি গ্রহের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ হচ্ছে টাইটান (Titan)।

১৫. গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে ৯৬.৩% মলিক্যুলার হাইড্রোজেন, ৩.২৫% হিলিয়াম রয়েছে এবং বাকি অংশে আছে অ্যামোনিয়া, ইথেন, প্রোপেন, ফসফিন, মিথেন ইত্যাদি।

১৬. এর ঘনত্ব পৃথিবীর থেকে ৮ গুণ কম যা কিনা পানির ঘনত্ব থেকেও কম। এর অর্থ, যদি কোনোভাবে এটিকে পানির উপর রাখা হয়, তাহলে দেখা যাবে গ্রহটি পানির উপর ভাসছে। (কল্পনা)

১৭. গ্রহটিতে সর্বদা সাইক্লোন ঘূর্ণিঝড় বইতে থাকে।

৩. ইউরেনাস (Uranus)

১. ইউরেনাস আকারের দিক থেকে তৃতীয়, ভরের দিক দিয়ে চতুর্থ এবং ক্রমের দিক থেকে সৌরজগতের সপ্তম গ্রহ।

২. এই গ্রহটির নামকরণ করা হয়েছে গ্রীক মিথলজির দেবতা ইউরেনাসের নামে।

৩. ইউরেনাস টেলিস্কোপের মাধ্যমে আবিষ্কৃত প্রথম গ্রহ।

৪. সূর্য থেকে এর দূরত্ব ৩ বিলিয়ন কিলোমিটার। তাই সূর্য থেকে এই গ্রহে আলো আসতে সময় লাগে দুই ঘন্টা। ইউরেনাসে নাসা কর্তৃক মাত্র একটি মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে। সেটি হচ্ছে ভয়েজার-২।

৫. এটি খালি চোখে দেখা গেলেও প্রাচীন পর্যবেক্ষকগণ একে গ্রহ বলে ভাবেন নি যেহেতু এটি রাতের আকাশে তেমন উজ্জ্বল নয়।

৬. এ গ্রহের তাপমাত্রা –৩৫৩° ফারেনহাইট।

৭. গ্রহটি নিজ অক্ষের উপর ৯৭.৭৭° হেলে রয়েছে।

৮. এ গ্রহটিতে হীরার বৃষ্টি হয়ে থাকে।

৯. এটি মুখ্য রুপে মলিক্যুলার হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে তৈরি। এছাড়া মিথেনও রয়েছে।

১০. এ গ্রহের ১দিন = ১৭ ঘন্টা ১৪ মিনিট এবং ১ বছর = ৮৪ বছর।

১১. ইউরেনাস গ্রহে যে সাইক্লোন হয় সেটা বৃহস্পতি গ্রহের থেকেও ভয়াবহ। এর বেগ প্রতি ঘন্টায় ৮২৪ কিলোমিটার অন্যদিকে, বৃহস্পতির মাত্র ৬৮০ কিলোমিটার!

১২. ইউরেনাসের ১৩ টি রিং এবং ২৭ টি চাঁদ আছে। টাইটানিয়া (Titania) ইউরেনাস গ্রহের সবচেয়ে বড় চাঁদ।

৪. নেপচুন (Neptune)

১. ইউরেনাস গ্রহ আবিষ্কার হওয়ার ৫০ বছর পর নেপচুন গ্রহটি আবিষ্কৃত হয়েছে।

২. এটি সৌরজগতের ৮ম ও শেষ গ্রহ। এর ভর পৃথিবীর ভরের চেয়ে ১৭ গুণ বেশি এবং মহাকর্ষ ১.১৪ শতাংশ বেশি।

৩. সূর্য থেকে এ গ্রহে আলো আসতে সময় লাগে ২৪৯ মিনিট।

৪. সূর্য থেকে গ্রহটির দূরত্ব প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন কিলোমিটার। এ কারণে এই গ্রহটি সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা।

৫. নেপচুন গ্রহের পৃষ্ঠে একটি গাঢ় কালচে নীল দাগ রয়েছে। যাকে বলা হয় 'The Great Dark Spot'. এটি একটি বৃহৎ ঘূর্ণন ঝড়।

৬. গানিতিক ভবিষ্যতবাণীর মাধ্যমে এ গ্রহটিকে আবিষ্কার করা হয়েছে।

৭. গ্রহটির ১ দিন = ১৬ ঘন্টা ৬ মিনিট এবং ১ বছর = ১৬৫ বছর।

৮. নেপচুনেরও বলয় রয়েছে তবে সেগুলো অস্পষ্ট এবং হালকা।

৯. এর পৃষ্ঠতল জল, মিথেন, অ্যামোনিয়া ইত্যাদি দিয়ে তৈরি। এর মধ্যে বিধ্বংসী ঝড় উঠে। গ্রহটিতে বাতাসের গতিবেগ এত বেশি যে পৃথিবীতে এ বাতাস বইলে এটি বড় আকারের একটি গাছও উপড়ে ফেলবে।

১০. রোমানরা প্রাচীনকালে গ্রহ নক্ষত্রদের নাম দিতো তাদের দেবতাদের নামে। নেপচুন দেখতে সমুদ্রের মতো অর্থাৎ নীল রঙের হওয়ায় এর নাম দেওয়া হয়েছে রোমান সমুদ্র দেবতা নেপচুনের নামে।

১১. নেপচুন এবং ইউরেনাস উভয় গ্রহের কেন্দ্রে কার্বন থাকায় এখানে চারিদিকে হীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে।

১২. নেপচুন গ্রহের কেন্দ্র শিলা, লোহা এবং বরফের দ্বারা তৈরি।

১৩. এর বায়ুমণ্ডলে ৮০% হাইড্রোজেন, ১৯% হিলিয়াম ও মিথেন দিয়ে তৈরি।

১৪. গ্রহটির ১৪ টি উপগ্রহ বা চাঁদ রয়েছে। ট্রাইটন হচ্ছে নেপচুনের সবচেয়ে বড় চাঁদ। ট্রাইটনের তাপমাত্রা নেপচুন গ্রহের চেয়েও কম। এর তাপমাত্রা –২৪০° সেলসিয়াস।

১৫. নেপচুনের 'নীল গ্রহ' নামেও ডাকা হয়।

নিয়মিত এ ধরনের লেখা পেতে টেকটিউনস এর সাথেই থাকুন।

Level 1

আমি জান্নাতুল ফেরদৌস ইভা। এসএসসি ২০২২, খায়রুল্লাহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 4 মাস 2 সপ্তাহ যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 10 টি টিউন ও 14 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 6 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 8 টিউনারকে ফলো করি।


টিউনস


আরও টিউনস


টিউনারের আরও টিউনস


টিউমেন্টস