পৃথিবী থেকে সবচাইতে দূরে যাওয়া মহাকাশযান ভয়েজার মিশন সম্পর্কে জানুন আদ্যোপান্ত

Level 9
এইচএসসি ২য় বর্ষ, জুমারবাড়ী আর্দশ ডিগ্রি কলেজ, গাইবান্ধা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা ১৯৭০ এর শেষ দশকে, অর্থাৎ ১৯৭৭ সালে মানুষবিহীন দুটি মহাকাশ যান ভয়েজার-১ এবং ভয়েজার-২ নামে দুটি মহাকাশযানকে উৎক্ষেপণ করে। এগুলো প্রথম মানব নির্মিত বস্তু, যেগুলো এখনো পর্যন্ত সৌরজগতের এত দূরত্ব অতিক্রম করেছে।

বন্ধুরা আজকের এই টিউন এর মাধ্যমে আপনারা জানতে পারবেন, নাসার তৈরি করা ভয়েজার-১ কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়ে। আজকের এই টিউন টি আমি আপনাকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে দেখার অনুরোধ করছি।

নাসার ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২ মিশন

ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২ মহাকাশ যান

নাসার ভয়েজার মিশনের উদ্দেশ্য ছিল যে, ভয়েজার নভোযান গুলো দিয়ে পাঁচ বছর মহাকাশে বিচরণ করে জুপিটারশনি গ্রহ এবং তাদের উপগ্রহগুলো কে পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু উৎক্ষেপণের ৪৪ বছর পর বিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে দিয়ে সেই ভয়েজার নভোযান দুটি চারটি গ্রহ এবং ৪৮ টি উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ করে আজও মহাকাশে সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। শুধু তাই নয়, পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়া মানুষের তৈরি বস্তু ভয়েজার-১। যা আমাদের সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে ছুটে চলেছে নক্ষত্রমণ্ডলে।

আমাদের সৌরজগৎ কে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে ভয়েজার মিশন শুরু করা হয়েছিল। এই মিশনের অধীনে দুইটি মহাকাশযান প্রেরণ করা হয়। আর এগুলো হলো ভয়েজার-১ এবং ভয়েজার-২। ভয়েজার থেকে এত এত নতুন তথ্য পাওয়া গেছে যে, যার কারণে সেই নতুন তথ্য এবং ধারণার কারণে তা দিয়ে জ্যোতির্বিদ্যার বইগুলোকে আবার প্রায় নতুন ভাবে লিখতে হয়েছে। ভয়েজার-২ মহাকাশযান টি ভয়েজার-১ এর আগে যাত্রা শুরু করে।

ভয়েজার-২ এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৭ সালের আগস্টের ২০ তারিখে এবং ভয়েজার-১ যাত্রা করে একই বছর সেপ্টেম্বর ৫ তারিখে। প্রায় ৪৪ বছর আগে মহাকাশে পাঠানো হলেও, ভয়েজার যান গুলো আজও তাদের মিশন সফলতার সাথে পরিচালনা করে যাচ্ছে। ভয়েজার-১ এবং ভয়েজার-২ আমাদের সৌরজগতের সকল বড় গ্রহ গুলোতে অভিযান পরিচালনা করেছে।

জুপিটার, শনি, ইউরেনাসনেপচুন গ্রহ এবং এসব গ্রহের ৪৮ টি উপগ্রহ, গ্রহ বলয় ও চৌম্বক ক্ষেত্র সম্পর্কে অভূতপূর্ব তথ্য প্রদান করেছে ভয়েজার। ভয়েজার-১ পরে উৎক্ষেপণ করা হলেও এর গতিবেগ ভয়েজার-২ এর চেয়ে বেশি হওয়ার কারণে সেটি সকল আগে গন্তব্যে পৌঁছে। ভয়েজার-১ শুধুমাত্র জুপিটার ও শনি গ্রহ এবং এদের উপগ্রহ পরিদর্শন করে। এবং ভয়েজার-২ জুপিটার, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন গ্রহ সহ তাদের উপগ্রহ গুলো পরিদর্শন করে।

ভয়েজার যানগুলো আমাদের থেকে কত দূরে?

ভয়েজার নভোযান এর অবস্থান

সৌরজগতের এসব অভিযান শেষে নভোযান দুটি আলাদা আলাদা পথে অসীমের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণের দেড় বছর পর ভয়েজার-১ জুপিটার গ্রহে পৌঁছায়। এরপর শনি গ্রহে যেতে ভয়েজার-১ এর সময় লাগে ৩ বছর ২ মাস।

ভয়েজার-২ এর পৃথিবী থেকে ইউরেনাস গ্রহ যেতে সময় লাগে আট বছর ৫ মাস এবং পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণের ১২ বছর পর ভয়েজার-২ নেপচুন গ্রহের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানো। এই মিশন শেষে আমাদের সৌরজগৎ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। এরপর এরা আমাদের সৌরজগতের সীমানাও পেরিয়ে যায়, তবে এক্ষেত্রে ভয়েজার মিশন ই প্রথম নয়।

১৯৯৮ সালে পাইয়োনিয়ার ১০ এবং পাইয়োনিয়ার ১১ মনুষ্য নির্মিত সর্বপ্রথম কোন বস্তু, যা আমাদের সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ ছাপিয়ে গিয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে ভয়েজার-১ পাইয়োনিয়ার কে পিছে ফেলে দিয়েছে। ভয়েজার-১ বর্তমানে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়া মনুষের নির্মিত মহাকাশযান।
ভয়েজার নভোযান আমাদের থেকে কত দূরে?

নাসার তথ্য মতে ২০২০ সালের এপ্রিলে ভয়েজার-১ আমাদের সূর্য থেকে প্রায় সাড়ে ২২ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেছে এবং ভয়েজার-২ অতিক্রম করেছে সাড়ে ১৮ বিলিয়ন কিলোমিটার। ভয়েজার-১ প্রতি বছর প্রায় ৫৪ কোটি কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে এবং ভয়েজার-২ প্রতি বছর অতিক্রম করে প্রায় ৪৯ কোটি কিলোমিটার। তার মানে, ভয়েজার-১ প্রতি ঘন্টায় প্রায় ৬৩ হাজার কিলোমিটার গতিবেগে ছুটে চলেছে।

এটি এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে দ্রুতগামী নভোযান। আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে উদ্ভাবন করা হলেও আধুনিক রকেট বা মহাকাশ যান ও এই গতি কে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি‌। এত দ্রুত গতিতে এত দীর্ঘ দিন মহাকাশে অভিযান পরিচালনা করার জন্য ভয়েজারের খুব বেশি জ্বালানীর প্রয়োজন হয়নি। কারণ গ্রাভিটি অ্যাসিস্ট পদ্ধতি ব্যবহার করে যান দুটি এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহের দিকে এগিয়ে গেছে। কোন গ্রহের মহাকর্ষ টান ব্যবহার করে সেই গ্রহের দিকে ধাবিত হওয়া কে গ্রাভিটি অ্যাসিস্ট বলা হয়।

তবে এই নভোযান দুটির যন্ত্রপাতি ঠিক রাখার জন্য প্লোটনিয়াম ধাতুর তৈরি ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিল যে, ২০২০ সালের পর এই ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু ভয়েজার এর ব্যাটারি এখনো সচল অবস্থায় রয়েছে।

ভয়েজার নভোযান নিয়ে গবেষণা

ভয়েজার নভোযান নিয়ে গবেষণা

দুটি ভয়েজার মিশনেই একটি বিশেষ গ্রামোফোন ডিস্কে রেকর্ড করা কিছু বার্তা পাঠানো হয়েছিল। সোনার পাতে মোড়া সেই ডিস্কে পৃথিবীর ৫৫ টি ভাষায় শুভেচ্ছা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন বস্তুর ১১৫ টি ছবি ছিল। এর কারণ হলো, ভিনগ্রহের কোন বুদ্ধিমান প্রাণী যদি ভয়েজার খুঁজে পায়, তাহলে তারা যেন এই ডিস্ক থেকে পৃথিবীর সম্পর্কে জানতে পারে।

যেখানে আমাদের সৌরজগতের সীমানা শেষ হয়েছে তাকে বলে, টার্মিনেশন শক। ভয়েজার-১ মহাকাশ যানটি ২০০৪ সালে এবং ভয়েজার-২ যানটি ২০০৭ সালে টার্মিনেশন শক অতিক্রম করেছে। টার্মিনেশন শক এর পরের স্তরকে বলা হয় হেলিওস্ফেয়ার। এই হেলিওস্ফেয়ার এর পরেই ইন্টারস্টেলার স্পেস বা নক্ষত্রমণ্ডলের শুরু। ভয়েজার-১ ২০১২ সালে ইন্টারস্টেলার স্পেসে প্রবেশ করেছে এবং ভয়েজার-২ এই জগতে পৌঁছায় ২০১৮ সালে।

পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বে যাওয়ার পরেও ভয়েজারের সাথে পৃথিবীর যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। নাসার উদ্ভাবিত ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক নামের এক ধরনের বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে ভয়েজার পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। তবে এর প্রধান সমস্যা হলো এই যোগাযোগ পদ্ধতি খুবই ধীর গতির। ভয়েজার থেকে কোন বার্তা পৃথিবীতে আসতে প্রায় ১৭ ঘণ্টা সময় লাগে এবং দিনদিন ভয়েজার যত দূরে যাচ্ছে যোগাযোগের বিলম্ব ততই বেড়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে ভয়েজারে থাকা পাঁচটি যন্ত্রের সাহায্যে মহাকাশের ৫ ধরনের গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও আরও বেশ কিছু তথ্য ভয়েজার থেকে পাওয়া গেলেও সেসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে না। ভয়েজার নভোযান দুটি আমাদের সৌর জগতের সীমা অতিক্রম করতে পারলেও আমাদের ছায়াপথের সীমা কখনো অতিক্রম করতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। কারণ একটি ছায়াপথ আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বড়। বেশ কয়টি গ্রহ উপগ্রহ মিলে যেমন একটি সৌর জগত গড়ে ওঠে, ঠিক তেমনিভাবে বহু সৌরজগৎ মিলে সৃষ্টি হয় একটি ছায়াপথ বা গ্যালাক্সি।

শেষ কথা

মানুষ সেই শুরু থেকেই অজানাকে জানার ক্ষেত্রে অদম্য। আর সেই জানার চেষ্টা থেকেই মানুষ তৈরি করেছে যানবাহন এবং এক পর্যায়ে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন থেকে বানিয়েছে উড়োজাহাজ। আর উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন পূরণ হবার পর মানুষ দেখতে চেয়েছে বাহিরের জগতটাকে। আমাদের পৃথিবীর বাইরে কি রয়েছে সেটি জানার চেষ্টা থেকেই ভয়েজারের যাত্রা

তো বন্ধুরা, আজকের টিউনটি ভাল লাগলে আমাকে অবশ্যই ফলো করে রাখবেন। যাতে করে ভবিষ্যতে আপনাদের জন্য নতুন কোন টিউন নিয়ে আসার অনুপ্রেরণা পাই। আসসালামু আলাইকুম।

Level 9

আমি আতিকুর ইসলাম। এইচএসসি ২য় বর্ষ, জুমারবাড়ী আর্দশ ডিগ্রি কলেজ, গাইবান্ধা। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 1 বছর যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 201 টি টিউন ও 74 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 31 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 2 টিউনারকে ফলো করি।

আমি আতিকুর ইসলাম (Atikur Islam)। শুরু থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে জানা এবং অন্যকে শেখানোর এক প্রবল ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই, বিশ্বের প্রযুক্তি প্রেমীদের কাছে নিজের জানা কথাকে প্রকাশ করতে টেকটিউনসে আমার পথচলা।


টিউনস


আরও টিউনস


টিউনারের আরও টিউনস


টিউমেন্টস