কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিদ্যুৎ-তৃষ্ণা মেটাতে কম্পিউটারে যুক্ত হচ্ছে ‘জীবন্ত মানব মস্তিষ্ক’!

Level 2
Senior Executive, Digital Marketing & eSports, GIGA-BYTE Technology Co., Ltd., Dhaka, Bangladesh

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সাহায্যে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে একটি চমৎকার ছবি তৈরি করা বর্তমানে আমাদের জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতার বিষয়। কিন্তু এর পেছনের প্রযুক্তিগত কর্মযজ্ঞ কতটা বিশাল, তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? অবাক করা বিষয় হলো, এআই ব্যবহার করে একটি হাই-কোয়ালিটি ছবি জেনারেট করতে যে পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, তা দিয়ে একটি স্মার্টফোন অনায়াসেই ফুল চার্জ করা সম্ভব। অ্যামাজন, মেটা এবং গুগলের মতো টেক জায়ান্টগুলো এআই-এর এই গগনচুম্বী বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করছে। প্রযুক্তির এই রাক্ষুসে ক্ষুধা মেটাতে বিজ্ঞানীরা এবার এমন এক যুগান্তকারী ও রোমাঞ্চকর পথ বেছে নিয়েছেন, যা কল্পবিজ্ঞানকেও হার মানায়। সিলিকন চিপের বদলে কম্পিউটারের ভেতরে তারা ব্যবহার শুরু করেছেন জীবন্ত মানব মস্তিষ্ক বা নিউরন!

সাধারণত আমরা জানি, কম্পিউটার চলে সিলিকন চিপের সাহায্যে। কিন্তু সম্প্রতি প্রযুক্তি দুনিয়ায় এমন এক দৃশ্য সামনে এসেছে যা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। 'কোর্টিক্যাল' (Cortical) নামের একটি হাইটেক ল্যাবে এমন এক অভিনব কম্পিউটার তৈরি করা হয়েছে, যা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় ভিডিও গেম 'ডুম' (Doom) খেলছে। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই গেমটি কোনো সাধারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা প্রোগ্রাম খেলছে না, খেলছে মেশিনের ভেতর থাকা জীবন্ত মানব মস্তিষ্কের কোষ। সিলিকন চিপ নয়, বরং জীবন্ত কোষগুলোই স্ক্রিনে থাকা শত্রুদের ওপর নিখুঁতভাবে ফায়ার করছে এবং গেমের লেভেল পার করছে।

কিন্তু কেন বিজ্ঞানীদের এমন একটি অবিশ্বাস্য পদক্ষেপ নিতে হলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনীয়তা—বিদ্যুৎ সংকটের মাঝে। এআই মেশিন এবং সুপারকম্পিউটারগুলো কী পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করে, তা জানলে যে কারও চোখ কপালে উঠবে। বৃহৎ পরিসরের এআই মডেলগুলোকে ট্রেইন করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির চাহিদা প্রতি ৬ মাসেই দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে পৃথিবীতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এবং এআই-এর জন্য যা প্রয়োজন—এই দুইয়ের মাঝে একটি বিপজ্জনক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। টেক জায়ান্টদের এখনকার স্নায়ুযুদ্ধ শুধু উন্নত সফটওয়্যার তৈরির নয়, বরং বিশ্বের সর্বাধিক বিদ্যুৎ মজুদের লড়াই।

বিদ্যুৎ ঘাটতির এই ভয়াবহ ভবিষ্যৎ থেকে বাঁচতেই বিজ্ঞানীরা মানব মস্তিষ্কের শরণাপন্ন হয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক এই বায়োকম্পিউটার সিস্টেমে মূলত তিনটি অংশ থাকে—সিলিকন এআই চিপ, ট্রান্সলেটর এবং প্রায় ২ লাখ জীবন্ত মানব নিউরন। ইনপুট সিগন্যাল পাওয়ার পর এই জীবন্ত কোষগুলোই মূলত বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজটি করে। বিশেষজ্ঞরা যখন পরীক্ষার জন্য এই কোষগুলোর জায়গায় ভুয়া সিগন্যাল পাঠিয়েছিলেন, তখন কম্পিউটারটি সঠিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে ব্যর্থ হয়। অর্থাৎ, এটি প্রমাণিত যে এই জীবন্ত কোষগুলো আসলেই চিন্তা করে কাজ করতে সক্ষম।

সবচেয়ে অভাবনীয় খবর হলো, এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বাণিজ্যিকভাবেও কাজ শুরু করেছে। 'ফাইনাল স্পার্ক' (Final Spark) নামের একটি সুইস কোম্পানি ইন্টারনেটের মাধ্যমে জীবন্ত মানব নিউরন বা 'মিনি ব্রেইন' ভাড়া দিচ্ছে। যে কেউ মাসিক ফি পরিশোধ করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে তাদের এই বায়োলজিক্যাল কম্পিউটারে কোড রান করতে পারবেন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সাধারণ মাইক্রোচিপের তুলনায় এই জীবন্ত কোষগুলো ১০ লাখ গুণ কম শক্তিতে বা বিদ্যুতে চলতে সক্ষম!

প্রযুক্তির এই নতুন দিগন্ত কেবল এআই-এর বিদ্যুৎ সংকটই মেটাবে না, বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানেও বড় ধরনের বিপ্লব আনবে। এই গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আলঝেইমার্স ও পারকিনসন্স-এর মতো দুরারোগ্য স্নায়ুবিক রোগের চিকিৎসায় নতুন পথ উন্মোচিত হবে বলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী।

সিলিকন আর মাইক্রোচিপের দৌড়ে পৃথিবী যখন ক্লান্ত, প্রকৃতি তখন আবারও দেখিয়ে দিলো যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সাশ্রয়ী কম্পিউটিং পাওয়ার মানুষের নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। আগামী প্রজন্মের সুপারকম্পিউটার কেবল লোহা বা প্লাস্টিকের হবে, নাকি জীবন্ত মাংসপেশি ও মস্তিষ্কের সমন্বয়ে তৈরি হবে—সেটাই এখন প্রযুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও রোমাঞ্চকর কৌতূহল।

Level 2

আমি নাজমুল ইসলাম আবির। Senior Executive, Digital Marketing & eSports, GIGA-BYTE Technology Co., Ltd., Dhaka, Bangladesh। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 5 বছর 3 মাস যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 11 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।


টিউনস


আরও টিউনস


টিউনারের আরও টিউনস


টিউমেন্টস