একটি অন্ধকার ঘরের এক কোণে পড়ে আছে জহিরের লাশ। সৌদিআরব সময় রাত তিন টা একুশ মিনিটে সে মারা গেছে। একজন ভিনদেশী নাগরিক হওয়ায় তার লাশ ছাড়াতে আইনি জটিলতা বেশি। তাই বন্ধু বান্ধবরা রাতে আর তার খোঁজ নিতে এলো না। কাল সকালেই কাজে যোগ দিতে হবে। লাশের বিষয় টা দু একদিন পর দেখা যাবে। আজ রাতে তারা বিশ্রাম নেবে ভেবে বাড়ি ফিরে গেলো। একটি অন্ধকার ঘরের এক কোণে পড়ে থাকলো একটি পরিবারের নিভে যাওয়া স্বপ্ন।
বাংলাদেশে তখন ভোর। নামাজ শেষ করে নিলুফা বেগম রোজ তার ছেলের জন্য দোয়া করে। এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ছেলের জন্য আতপ চাল, কুমোর বরি, শুঁকনো ডাল জমিয়ে রাখা ও তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রায়ই সে ভালো কিছু রান্না হলে ছেলের জন্য বাটিতে করে তুলে রাখে। কারণ যাওয়ার আগে জহির বলে ছিল, " ধরো কোনো একদিন তোমাকে না জানিয়ে হুট করে দেশে ফিরে আসলাম। তোমার কেমন লাগবে? " নিলুফার চোখ আনন্দে ঝলমল করে উঠেছিল। সে ভেবেনিয়েছে জহির এমনটাই করবে। তার দুষ্টুমির শেষ নেই। জামিলা প্রায়ই বলতো, " ভাইয়া তুমি গ্রামেই কিছু করো। বিদেশ যাওয়ার কী দরকার? "
এর উত্তরে ও জহিরের খুনসুটি থাকতই। সে বলতো, " আরে বিদেশ থেকে সুন্দরী বউ আনতে হবে না? তোর মত পেত্নী মেয়ে বিয়ে করবো নাকি?" নিলুফা হেসে ফেললো। বড়ই ভালো ছেলে তার জহির। কোনো দিনও মায়ের মনে কষ্ট দেয়নি সে। মায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা সে তার দায়িত্ব বানিয়ে ফেলেছে। মায়াবী চেহারার হাসি খুশি ছেলেটা কে দেখলেই তার মনটা ভরে যায়। মনে হয় আল্লাহ তাকে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর নিয়ামত দান করেছেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর জহির কিছু দিনের জন্য গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। থম থমে মুখ করে সারা দিন পুকুর পাড়ে বসে থাকতো। সে হয়তো বুঝতে পেরেছিল যে বাস্তবতা অনেক কঠিন। সংসারের দায়িত্ব, মায়ের দায়িত্ব, ঘরে যুবতী বোন তার বিয়ের দায়িত্ব। সব মিলে কিছু দিন হতাশায় কাটিয়েছে ছেলেটি। এর পর হুট করেই একদিন হাসি মুখে এসে বললো, " মা আজকে আমার মন খুব ভালো। সব চিন্তা দূর হয়ে গেছে। " নিলুফা অবাক হয়ে তাকায় ছেলের দিকে। তার হাসি খুশি জহির কে সে ফিরে পেয়েছে। তার আর কিছু চাই না। জহির আপন মনে বলতে থাকে, " তারেক ভাই বললো সৌদিআরবে এখন নাকি কাজের অনেক সুযোগ। বাংলাদেশ থেকে কেউ গেলে তার কোনো না কোনো ব্যাবস্থা করে দেওয়া যাবে। ভাবছি তারেক ভাইয়ের কাছে চলে যাবো। কিছু দিন দেশের বাইরে থেকে আসি। " নিলুফার চোখ ছল ছল করে ওঠে। তার সোনার টুকরো ছেলেকে না দেখে তার একটা দিনও শুরু হয় না। আর সেই ছেলে নাকি মাকে ছেড়ে বিদেশ যাবে। জহিরের কথা বিশ্বাস করে না নিলুফা। সে ভাবে জহির শেষ পর্যন্ত যেতে পারবে না। মাকে ছেড়ে সে কিছুতেই যেতে পারবে না।
কিন্তু নিলুফার মনে সন্ধে ঘনিয়ে আসে যখন সে দেখে জহির বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। এদিক সেদিক টাকার জন্য ফোন দিচ্ছে। গ্রামের মুরুব্বিদের বাড়ি দিন রাত ঘোরাফেরা করছে। নিলুফা মুখ ভার করে থাকে। অভিমানে কথা বলে না ছেলের সাথে। মাঝে মাঝে মনে হয় জহির তার বাবার মতো হয়েছে। দূর সময়ে ছেড়ে চলে যায়। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে কেটে রাখা সবজির ওপর। মায়ের চোখের জল চোখ এড়ায় না জহিরের। সে হাসির ছলে মাতিয়ে রাখতে চায় মায়ের মন। নিলুফা অভিমান ভেঙে বলেই ফেলে, " বাবা, বিদেশ না গেলে হয় না? আমাদের যা আছে তাই নিয়েই না হয় মায়ে ছেলে মিলে থাকবো। তোকে ছাড়া তো আমি থাকতে পারি না। " জহির কথা ঘুরায়, " খুব ক্ষুধা লেগেছে মা। তাড়াতাড়ি গরম গরম ভাত বেড়ে দাও। "
নামাজের জায়গায় বসে নিলুফা ভাবে, জহির যে দিন চলে যায় সে দিন সকাল থেকে আকাশ কেমন মেঘলা হয়ে ছিল। পৃথিবীর মতো মায়ের মন ও ভারী হয়ে আসছে, চোখ ভরে আসছে জলে। জহির পিছু ফিরে তাকায় না। সোজা চলে গিয়ে অটো তে উঠে পড়ে। হুট করেই দুই এক মিনিটের মধ্যে নিলুফার পৃথিবী থেকে কি যেনো হারিয়ে যায়। সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করে তার তেতাল্লিশ বছরের জীবনে এতো টা একা তার কোনো দিনও লাগেনি। এমনকি স্বামী মারা যাওয়ার পর ও না। চোখ মুছলো নিলুফা। প্রতিদিন ভোরে নামাজ শেষে সে এসব স্মৃতি মনে মনে স্মরণ করে। জহিরের রেখে যাওয়া জমা কাপড় সে রোজই রোদে দেয় যেনো মনে হয় সে বাড়িতেই আছে। জামিলা যখন বাড়ি থাকে না তখন সে জহিরের সাথে কথা ও বলে। রান্না করতে করতে বলে, " বাজান, আজকে লাউ শাক রান্না করতিছি। তোমার খুব প্রিয় খাবার। যাও ঘর থেকে প্লেট আনো গরম গরম ভাত খাও। " তারপর আপন মনেই হেসে ওঠে নিলুফা। মানুষ শুনলে পাগল বলবে তাকে।
মা অপেক্ষা করে ছেলের ফিরে আসার। দিনের পর দিন পথ চেয়ে থাকে। তার অপেক্ষার কাছে হার মেনে যায় পৃথিবীর সব কিছু।
গত পরশু দিন তারেকের বউ এসে বলেছে তারেক দুই একের মধ্যে দেশে আসবে। নিলুফার ক্ষীণ সন্দেহ যে জহির ও তারেকের সাথে আসবে। সে আসবে কিন্তু মাকে বলবে না। এটাই তার প্ল্যান। কিন্তু মায়ের মন আগে থেকেই ছেলের খবর জানে সেটা জহির বুঝতে পারে না। এসব ভাবতে ভাবতে অনেক বেলা হয়ে যায়। অনেক কাজ পরে আছে তার। জায়নামাজ ছেড়ে উঠে পড়ে নিলুফা।
৫ দিন পর।
তারেকের গলা শুনে ঘুম ভেংগে যায় নিলুফার। চোখ মেলে দেখে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কখন বৃষ্টি হয়েছে খেয়াল নেই। অনেক দিন পর সে এমন গভীর ঘুম ঘুমিয়েছিল। উঠোনে এসে তারেক কে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায় নিলুফা। তারেককে বলে, " জহির আসেনি? " এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার বলে, " আমি জানি জহির তোমার সাথেই এসেছে। হুট করে এসে বলবে, মা আমি এসেছি। " তারেক মাথা নিচু করে আছে। নিলুফার কণ্ঠ তার মস্তিষ্ক ভেদ করে বেরিয়ে গেলো। জহির তার সাথেই এসেছে। ২০ তলা বিল্ডিং এ বিদ্যুতের লাইন দিতে গিয়ে সে সেখান থেকে পরে গেছে। পাঁজরের পাঁচটা হাড় আর চোয়ালের তিনটা দাত ভেঙে গেছে। সে একটি বাক্সের ভেতর শুয়ে আছে। ৫ দিন হলো হিম ঘরে থেকে তার লাশ সাদা হয়ে গেছে। দ্রুত তাকে কবর দেওয়া দরকার। এসব তথ্য নিলুফা কে দেওয়া এখন তারেকের কাছে পৃথিবীর সব থেকে কঠিন কাজ। সে বুঝতে পারছে না এমন একটা দায়িত্ব আল্লাহ তাকেই কেনো দিলো। তারেকের নিজের ছেলের মুখটা চোখে ভেসে উঠলো। সে ও তার ছেলেকে খুব ভালোবাসে। এই মুহূর্তে তারেকের মনে হচ্ছে পৃথিবীতে অনেক মায়া মহব্বত আছে কিন্তু মা বাবার মায়া মহব্বত এর কাছে অন্য সবগুলো তুচ্ছ। এই পৃথিবীতে আর কোনো দিন যেনো কোনো মানুষ বাবা মা না হয়।
আমি খাদিজা কুবরা। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 4 বছর যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 1 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।