
বাংলাদেশের গ্রীষ্মকাল মানেই প্রখর রোদ আর অসহ্য গরম। বিশেষ করে যারা শহরের বস্তি এলাকায় বা গ্রামে টিনের ঘরে থাকেন, তাদের কাছে এই সময়টা রীতিমতো ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা। সকাল ১০টা বাজার আগেই টিনের চাল গরম হয়ে ঘরকে আক্ষরিক অর্থেই ‘তন্দুর’ বানিয়ে ফেলে। ফ্যানের বাতাসও যেন গরম হাওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু চিন্তার কিছু নেই। কিছু সৃজনশীল ও কম খরচের কৌশল অবলম্বন করে আপনি সহজেই গরমে টিনের ঘর ঠান্ডা রাখার উপায় বের করতে পারেন। আসুন, এমন ১০টি কার্যকরী সমাধান জেনে নিই, যা আপনার টিনের ঘরের গরম কমানোর কৌশল হিসেবে কাজ করবে।
টিনের ঘর গরম হওয়ার মূল কারণ হলো সরাসরি সূর্যের আলো টিনের চালে পড়া। সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো ছাদের ১-২ ফুট উপরে একটি দ্বিতীয় স্তর তৈরি করা।
যেভাবে করবেন: বাঁশের ফ্রেম তৈরি করে তার ওপরে পুরনো কাপড়, চটের বস্তা, শুকনো খড় বা মোটা ত্রিপল টানিয়ে দিন।
সুবিধা: সূর্যের তাপ এই আবরণে আটকে যাবে এবং নিচের মূল টিনের চাল তুলনামূলক ঠান্ডা থাকবে। এটি ছাদের উপর ছাউনি পদ্ধতি নামে পরিচিত এবং অত্যন্ত সস্তা।
গাঢ় রঙ তাপ শোষণ করে, আর সাদা রঙ তাপ প্রতিফলিত করে। আপনার টিনের ছাদের ওপরের অংশ যদি মরিচা ধরে বাদামি হয়ে থাকে, তাহলে তা দ্রুত গরম হবে।
রিফ্লেক্টিভ পেইন্টিং: বাজারে এখন তাপ প্রতিরোধক পেইন্ট (Heat Reflective Paint) পাওয়া যায়। তবে কম খরচের সমাধান হলো ছাদের ওপরে চুনকাম করা। ঘন চুনের প্রলেপ সূর্যের তাপ অনেকটাই ফেরত দেবে এবং টিনের ছাদের তাপ নিরোধক নিশ্চিত করবে।

দিনের বেলায় যদি ছাদে বস্তা বা ধানের ছালা বিছিয়ে রাখা যায় এবং মাঝে মাঝে তাতে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে রাখা যায়, তাহলে ভিন্ন ফল পাবেন।
ইভাপোরেটিভ কুলিং: পানির বাষ্পীভবন তাপ শোষণ করে। ভেজা বস্তা ছাদের তাপমাত্রা ৫-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে পারে। এটি কম খরচে ছাদ ঠান্ডা রাখার পদ্ধতি হিসেবে খুবই জনপ্রিয়।
ভেতর থেকে যদি বাঁশ, কাপড় বা থার্মোকল (স্টাইরোফোম) শিট দিয়ে আরেকটি ছাদ তৈরি করে দেন, তাহলে ছাদ ও সিলিংয়ের মাঝে একটি তাপ নিরোধী বায়ুস্তর তৈরি হবে।
উপকরণ: বাজারে পাওয়া যায় এমন হালকা থার্মোকল শিট বা কার্টুনের বাক্স কেটে এটি করা যায়। এতে ঘরের উচ্চতা কিছুটা কমলেও গরমে টিনের ঘরে ঘুমানোর উপায় খুঁজতে গেলে এটি অত্যন্ত আরামদায়ক।
অনেকে ভুল করেন উপরের দিকে ফ্যান লাগিয়ে। টিনের ঘরের ক্ষেত্রে করণীয় হলো হট এয়ার আউট করা।
কৌশল: ঘরের একপাশের জানালায় বা দরজার ওপরের অংশে একটি এক্সজস্ট ফ্যান বসান যাতে গরম বাতাস বের করে দেয়। এর ঠিক বিপরীত পাশের জানালা খুলে রাখুন, যাতে ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করে। এটি একটি চমৎকার টিনের ঘর এসি ছাড়া ঠান্ডা করার উপায়।
শুকনো গরম বাতাস ঘরে ঢুকতে দেবেন না।
খেসের পর্দা: বাঁশের তৈরি খেসের পর্দা বা মোটা সুতি কাপড় জানালায় টাঙিয়ে তার ওপর পানি স্প্রে করুন। বাইরে থেকে আসা গরম বাতাস ভেজা কাপড় ভেদ করে ঠান্ডা হয়ে ঘরে ঢুকবে। এটা অনেকটা প্রাকৃতিক এসি-র মতো কাজ করে এবং ঘরের তাপমাত্রা কমানোর ঘরোয়া উপায় গুলোর মধ্যে সেরা।
যদি জায়গা থাকে, টিনের ঘরের চারপাশে কিংবা ছাদে টবে লতানো গাছ লাগান।
সবুজ পর্দা: লাউ, কুমড়া বা শিমের মতো লতানো গাছ টিনের বেড়া বা ছাদে (বাঁশের জাংলা বানিয়ে) উঠিয়ে দিন। গাছের পাতা সূর্যের তাপ শোষণ করে এবং বাতাসে জলীয় বাষ্প ছেড়ে পরিবেশ ঠান্ডা রাখে। এটি একটি পরিবেশবান্ধব গাছপালা দিয়ে ঘর ঠান্ডা রাখা পদ্ধতি।
যাদের বাড়তি কিছু খরচ করার সামর্থ্য আছে, তারা টিনের ছাদের ওপর ২-৩ ইঞ্চি পুরু করে মাটির প্রলেপ দিতে পারেন। মাটি তাপ কুপরিবাহী, তাই নিচে তাপ আসতে চায় না।
মাটির কলসি: ঘরের কোণে একটি পানিভর্তি মাটির কলসি রাখুন। মাটি দিয়ে পানি চুইয়ে বাষ্পীভবন ঘটে, যা আশপাশের তাপমাত্রা কমায়।
আপনার টিনের ছাদে যদি কখনো সোলার প্যানেল বসানোর পরিকল্পনা থাকে, তাহলে জেনে রাখুন প্যানেলগুলো সরাসরি তাপ শোষণ করে বিদ্যুতে রূপান্তর করে, ফলে আপনার ছাদ সরাসরি গরম হয় না। এটি কিছুটা ব্যায়বহুল কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল বাঁচিয়ে এবং ছাদ ঠান্ডা রেখে দ্বিগুণ লাভ দেয়।
রাতে ঘুমানোর সময়ও অনেক কৌশল আছে।
মেঝে ঠান্ডা করা: ঘুমানোর আগে ঘরের মেঝেতে পানি ছিটিয়ে দিন। টিনের ঘরের মেঝে সিমেন্ট বা মাটির হলেও পানি ঢাললে ভ্যাপোরেটিভ কুলিং দ্রুত কাজ করে।
বরফের বাটি: টেবিল ফ্যানের সামনে একটি বাটিতে বরফ বা ঠান্ডা পানি রেখে ফ্যান চালান। দেখবেন ঘর মুহূর্তেই ঠান্ডা হচ্ছে।
লেখকের শেষ কথা
প্রচণ্ড দাবদাহে টিনের ঘরে জীবনধারণ করাটা সত্যিই কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এই গরমে টিনের ঘর ঠান্ডা রাখার উপায় গুলো অনুসরণ করলে আপনার কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দামি প্রযুক্তি বা এসির পেছনে টাকা খরচ না করে আমাদের দেশীয় এই জ্ঞান ও কম খরচের কৌশলগুলোই আপনাকে স্বস্তি দিতে পারে।
আজই আপনার ঘরের জন্য ছোট একটি পরিবর্তন আনুন, গরমকে পরাস্ত করুন! আরো নতুন নতুন এমন দরকারী টিপস পেতে আমার লেখা পড়তে পারে ইন্টেরিয়র বাড়ি ব্লগে
আপনার কি টিনের ঘর ঠান্ডা রাখার অন্য কোনো অভিনব উপায় জানা আছে? টিউমেন্ট করে আমাদের জানান!
আমি মাহফুজ বিশ্বাস। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 9 বছর 9 মাস যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 9 টি টিউন ও 3 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 1 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 1 টিউনারকে ফলো করি।
আমি মাহফুজ। একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও ইন্টেরিওর ডিজাইনার। নিজে খুব কম জানি,জানার চেষ্টা করি। যা জানি অন্যের সাথে শেয়ার করতে চেষ্টা করি।