
টাইম ট্রাভেল—শব্দটা শুনলেই মনে হয় যেন কল্পবিজ্ঞানের কোনো গল্প। কিন্তু বাস্তব বিজ্ঞান বলছে, অন্তত “অতীত দেখা”র ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই এগিয়ে গেছি। সরাসরি সময় ভ্রমণ না করেও আমরা অতীতের দৃশ্য দেখতে পারি। আর এই কাজটিই সম্ভব হয়েছে অত্যাধুনিক মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র—James Webb Space Telescope—এর মাধ্যমে।
ইতিমধ্যেই এই টেলিস্কোপ আমাদের এমন সব গ্যালাক্সির ছবি দেখিয়েছে, যেগুলো সৃষ্টি হয়েছিল বিগ ব্যাংয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি বছর পরে। ভাবুন, মহাবিশ্বের বয়স যেখানে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর, সেখানে আমরা তার শৈশবের ছবি দেখছি! প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক—কীভাবে সম্ভব?
এর উত্তর পেতে হলে যেতে হবে Big Bang-এর সময়ের ধারণায়। বিগ ব্যাং কোনো বিস্ফোরণ নয়, বরং এটি ছিল মহাবিশ্বের দ্রুত প্রসারণের সূচনা। সেই শুরুর মুহূর্তে সবকিছু ছিল অতি ঘন ও অতি উত্তপ্ত অবস্থায় আবদ্ধ। তখন স্থান, সময়, শক্তি—সব এক অদ্ভুত অবস্থায় ছিল।
বিগ ব্যাংয়ের পরপরই মৌলিক কণাগুলো আলাদা হতে শুরু করে। পদার্থবিজ্ঞানের চারটি মৌলিক বল—সবল নিউক্লিয়ার, দুর্বল নিউক্লিয়ার, তড়িৎ-চৌম্বকীয় এবং মহাকর্ষ বল—ক্রমে আলাদা হয়ে নিজ নিজ ভূমিকা নিতে শুরু করে। কিন্তু তখনো কোনো পরমাণু ছিল না; পুরো মহাবিশ্ব ছিল উত্তপ্ত প্লাজমায় ভরা, যেখানে ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস আলাদা অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ফলে আলো মুক্তভাবে চলাচল করতে পারছিল না।

প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পরে, যখন মহাবিশ্ব ঠান্ডা হতে শুরু করে, তখন ইলেকট্রন ও প্রোটন মিলিত হয়ে প্রথম পরমাণু তৈরি করে। এই ঘটনাকে বলা হয় রিকম্বিনেশন যুগ। এই সময় থেকেই আলো প্রথমবারের মতো স্বাধীনভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সেই আলোই আজ আমরা দেখি Cosmic Microwave Background হিসেবে—যা মূলত মহাবিশ্বের শৈশবের এক ধরনের প্রতিচ্ছবি।
এই CMB হচ্ছে একধরনের ক্ষীণ তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ, যার তাপমাত্রা প্রায় ২.৭ কেলভিন। এটি আমাদের বলে দেয়, মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থা কেমন ছিল—তার ঘনত্ব, তাপমাত্রা, এমনকি গঠনও।
এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে থাকে। এই প্রসারণের কারণে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যও বাড়তে থাকে—এ ঘটনাকে বলা হয় Redshift। সহজভাবে বললে, আলো যত দূর থেকে আসে, ততই তা লাল দিকে সরে যায়, অর্থাৎ তার শক্তি কমে এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায়।
এই জায়গাতেই আসে James Webb Space Telescope-এর অসাধারণ ক্ষমতা। এটি মূলত অবলোহিত (infrared) তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারে—যা সেই প্রাচীন আলোরই রূপান্তরিত সংস্করণ। কোটি কোটি বছর আগে কোনো গ্যালাক্সি থেকে বের হওয়া আলো আজ এসে পৌঁছায় আমাদের কাছে, আর এই টেলিস্কোপ সেই আলো ধরে ফেলে।
অর্থাৎ, আমরা যখন দূরের কোনো গ্যালাক্সি দেখি, তখন আসলে আমরা তার বর্তমান অবস্থা নয়, বরং অতীত দেখছি—যখন সেই আলো যাত্রা শুরু করেছিল। এই কারণেই বলা হয়, টেলিস্কোপ দিয়ে আমরা “টাইম ট্রাভেল” করি।
এই টেলিস্কোপটির গঠনও বেশ চমকপ্রদ। এতে রয়েছে ১৮টি ষড়ভুজাকৃতির আয়না, যা বেরিলিয়াম দিয়ে তৈরি এবং সোনার পাত দিয়ে আবৃত। কারণ সোনা অবলোহিত রশ্মি প্রতিফলনে অত্যন্ত কার্যকর। এই আয়নাগুলো মহাকাশ থেকে আসা ক্ষীণ ইনফ্রারেড আলো সংগ্রহ করে এবং তা বিশ্লেষণ করে ছবি তৈরি করে।

তবে একটি সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা যতই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করি না কেন, বিগ ব্যাংয়ের ঠিক মুহূর্তের ছবি দেখা সম্ভব নয়। কারণ সেই সময় আলোই মুক্ত ছিল না—ফলে কোনো সংকেতই আমাদের কাছে পৌঁছায়নি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আমরা হয়তো শরীর নিয়ে অতীতে যেতে পারি না, কিন্তু আলোর সাহায্যে অতীতকে দেখা—তা এখন আর কল্পনা নয়, বাস্তব।
আমি মো তানজিল সিরাজ সিরাজ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 3 দিন 6 ঘন্টা যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 7 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 13 টিউনারকে ফলো করি।