অদৃশ্য আয়নার কারিগর

    "আয়নার ওপাশে যা দেখছেন, তা কেবল আপনার প্রতিচ্ছবি নয়, আপনার হারিয়ে যাওয়া সময়ের অশরীরী রূপ। "।

​অর্ণব একজন শৌখিন ঘড়ি সংগ্রাহক। তবে তার ঝোঁক সব পুরনো ডিজিটাল ঘড়ির দিকে। একদিন ঢাকার এক পুরনো লোহালক্কড়ের দোকানে সে অদ্ভুত একটা কবজি ঘড়ি খুঁজে পেল। ঘড়িটা দেখতে স্টিলের, কিন্তু তার ডিসপ্লেতে কোনো সংখ্যা নেই—পুরো স্ক্রিনটা একটা ছোট আয়নার মতো স্বচ্ছ।
​দোকানদার বলেছিল, "এটা সময়ের ঘড়ি না স্যার, এটা উপস্থিতির ঘড়ি। " অর্ণব কথাটাকে গুরুত্ব না দিয়ে সস্তায় ওটা কিনে নিল।
​প্রথম সংকেত,
​বাড়ি ফেরার পর অর্ণব লক্ষ্য করল, ঘড়িটা হাতে পরলেই তার ঘরের পরিবেশ কেমন যেন ভারী হয়ে যায়। ডিসপ্লেতে কোনো সময় দেখা যায় না, শুধু অর্ণবের নিজের চোখের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আয়নায় তার চোখ দুটো যে দিকে তাকাচ্ছে, বাস্তবে অর্ণব সেদিকে তাকাচ্ছে না।
​সেদিন রাতে অর্ণব যখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, হঠাৎ ঘড়ির স্বচ্ছ স্ক্রিনে একটা নোটিফিকেশন ভেসে উঠল:
"অপেক্ষা করুন: লোডিং."
​আসল আতঙ্ক
​অর্ণব ভয় পেয়ে ঘড়িটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে দিল। কিন্তু আধঘণ্টা পর দেখল, ঘড়িটা আবার তার হাতে ফিরে এসেছে! সে নিশ্চিত সে ওটা খুলেছিল। এবার ঘড়ির ডিসপ্লেতে কোনো সংখ্যা নয়, বরং একটি দূরত্ব দেখাচ্ছে: ০.৫ মিটার।
​সে যত নড়ছে, এই দূরত্ব কমছে না। তার মানে, তার থেকে ঠিক আধা মিটার দূরত্বে কেউ বা কিছু একটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ সে ঘরে একা। সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। কিন্তু ঘড়ির স্ক্রিনে (যেটা আসলে একটা আয়না) দেখা যাচ্ছে, তার ঠিক পেছনে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে যার অবয়ব ঠিক অর্ণবের মতোই, কিন্তু তার কোনো চোখ নেই। সেখানে শুধু দুটো শূন্য গর্ত।
​অন্য রকম মোড়,
​গল্পের ক্লাইম্যাক্সটা এখানেই। সাধারণত ভূতেরা আমাদের ভয় দেখায়, কিন্তু এই 'সত্ত্বা'টি কথা বলতে শুরু করল অর্ণবের নিজের কণ্ঠস্বরে। তবে সেটা কান দিয়ে নয়, সরাসরি মগজের ভেতর।
​সত্ত্বাটি বলল, "ভয় পেয়ো না। আমি তোমার ফেলে আসা সময়। তুমি জীবনে যে মুহূর্তগুলো নষ্ট করেছ, যে সময়গুলোতে তুমি 'উপস্থিত' ছিলে না কিন্তু শরীরটা ছিল—আমি সেই অপ্রয়োজনীয় সময়ের অবয়ব। "
​অর্ণব দেখল, ঘড়ির সেই ডিজিটাল ডিসপ্লেতে এবার দূরত্বের বদলে একটা কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে:
১০. ৯. ৮.
​সে বুঝতে পারল, এই ঘড়িটা আসলে একটা 'এক্সচেঞ্জ ডিভাইস'। যে মানুষটা বর্তমান সময়ে থেকেও অনুপস্থিত থাকে, এই ঘড়ি তাকে চিরতরে সেই আয়নার ভেতরে বন্দি করে ফেলে, আর সেই ফেলে আসা শূন্য সময়টা মানুষের রূপ নিয়ে পৃথিবীতে বিচরণ শুরু করে।
​শেষ দৃশ্য,
​পরদিন সকালে অর্ণবের বন্ধু তাকে কল করল। অর্ণব ফোন ধরে খুব স্বাভাবিক স্বরে কথা বলল। কিন্তু সে খেয়াল করল না যে, সে যখন কথা বলছে, ঘরের আয়নায় তার কোনো প্রতিচ্ছবি পড়ছে না।
​আয়নার ওপাশে আসল অর্ণব চিৎকার করছে, দেয়ালে ঘুষি মারছে, কিন্তু কোনো শব্দ বাইরে আসছে না। আর এপাশে, 'নতুন অর্ণব' তার কবজি থেকে ঘড়িটা খুলে সেই একই লোহালক্কড়ের দোকানে ফেরত দিয়ে এলো।
​সেখানে ঘড়িটা এখন নতুন কারো জন্য অপেক্ষা করছে, যার জীবনে সময়ের কোনো মূল্য নেই।

Level 0

আমি কানিজ ফাতেমা জ্যোতি। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 14 ঘন্টা 39 মিনিট যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 1 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।


টিউনস


আরও টিউনস


টিউনারের আরও টিউনস


টিউমেন্টস