নিষেধাজ্ঞার চাবুকেই পূর্ণ ডানা মেলেছে ইরানের ড্রোন

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধে ইরান ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে ড্রোনকেই বেশি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। দেশটির এমন ড্রোনসক্ষমতা গোটা বিশ্বকে অবাক করেছে। কিন্তু এই সামর্থ্য একদিনে অর্জিত হয়নি; বরং প্রায় চল্লিশ বছর ধরে নিরলস প্রচেস্টার ফসল এটি।

১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এক বছর না যেতেই ইরাকের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়। ওই সময় ইরানের কাছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা অস্ত্রই ছিল, কারণ পূর্ববর্তী শাহ পাহলোভি সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সুসম্পর্ক ছিল। শাহ পাহলোভি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমানবাহিনীর জন্য ব্যাপক সামরিক সরঞ্জাম কিনেছিলেন। তাই যুদ্ধের প্রথম দিকে ইরান সক্ষমতা দেখালেও, পরে ইরাক উন্নত রাডার ব্যবহার করে ইরানি বিমান লক্ষ্য করে হামলা চালানো শুরু করলে পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ায়।

এই অভিজ্ঞতা থেকে ইরানি সরকার উপলব্ধি করে, এমন এক অস্ত্র প্রয়োজন যা যুদ্ধবিমানের মতো শক্তিশালী, তবু বিমান নয়, যাতে পাইলটের প্রয়োজন নেই, আবার খরচও তুলনামূলক কম। ঠিক সেই চিন্তা থেকেই ড্রোনপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ শুরু করে তেহরান। ১৯৮৪ সালে ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম মনুষ্যবিহীন বিমান তৈরির পরীক্ষা শুরু করে। একই সময়ে ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ড্রোনপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে বলে জানা যায়। কোন পক্ষই হোক না কেন, ইরানের ড্রোনযাত্রা শুরু হয়।

প্রথমদিকে তারা ‘আবাবিল’ নামের একটি ড্রোন তৈরি করে, যা কয়েক মাইল দূর থেকে হামলা চালাতে পারত এবং একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হতো। তখনও ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ চলছিল। ইরানের তখন স্যাটেলাইট ছিল না, ফলে ইরাকি সেনাদের ওপর নজরদারি ছিল দুরূহ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত তারা ‘মোহাজির-১’ ড্রোন তৈরি করে। এরপর বছরই বানায় ‘আবাবিল’ ড্রোন, যা দিয়ে ইরাকের ওপর হামলাও চালানো হয়। ১৯৮৬ সাল থেকে আবাবিলের উৎপাদন বাড়ানো এবং মানোন্নয়নের কাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আবাবিল এতটাই উন্নত হয় যে ‘আবাবিল-৩’ এখন একটানা আট ঘণ্টা উড়তে সক্ষম। প্রথম দিকের আবাবিল যেমন ছিল, পরবর্তী পর্যায়ে সেটি এক অসাধারণ অস্ত্রে পরিণত হয়।

উল্লেখ্য, আরব অঞ্চলের মধ্যে ইরান আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। অনেক আরব দেশ ধর্মীয় কুসংস্কারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকলেও ইরান প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে চেয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার পর টেলিগ্রাফি ব্যবহার শুরু করা প্রথম দেশগুলোর একটি ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো দেশের আগে তারা টেলিভিশন ও রেডিও চালু করে। এ ক্ষেত্রে নাসির আল-দিন শাহের (১৮৪৮-১৮৯৬) অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তিনি ইরানকে আধুনিক করার উদ্যোগ নেন। এরপর মোহাম্মদ রেজা শাহের সময় ১৯৫৭ সালে ইরানের পরমাণুকর্মসূচি শুরু হয়। তখনই ইরান মনে করে, দেশের ভেতরেই অস্ত্র তৈরি করতে হবে—যার একটি হলো ড্রোন। রেজা শাহ যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু ছিলেন বলেই ইরান তখনই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েনি।

কিন্তু ইরান যখন ১৯৮৪-৮৫ সালে ড্রোন তৈরির উদ্যোগ নেয়, তখনই যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর প্রথম সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে অস্ত্র কেনা বন্ধ হয়ে যায়, আর ইরাকের বিরুদ্ধে আট বছরের যুদ্ধে ইরানকে চরম বেগ পেতে হয়। ১৯৮৮ সালের ১৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন প্রেয়িং ম্যান্টিস’ নামে ইরানের নৌবাহিনীর ওপর কয়েক ঘণ্টা অভিযান চালায়। এক দিনেই প্রায় ধসে পড়ে ইরানের নৌশক্তি। ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বারবার মার খেয়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতা তলানিতে ঠেকে। ওপর ছিল নিষেধাজ্ঞা—কোনো দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার উপায় ছিল না।

তখন ইরান স্থির করে, যেসব অস্ত্র দেশের ভেতরেই তৈরি সম্ভব, সেগুলোতে জোর দিতে হবে। ড্রোন তেমনি একটি প্রকল্প। প্রথম দিকে আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণে ড্রোনকর্মসূচি তেমন অগ্রসর হচ্ছিল না। ফলে ১৯৯০-এর দশকে বেসামরিক লোকজন, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যুক্ত করা হয়। এতে রাতারাতি ড্রোনপ্রযুক্তির চিত্র বদলে যায়।

কেবল প্রযুক্তি জানলেই হয় না—দরকার হয় যন্ত্রাংশ। নিষেধাজ্ঞার কারণে কোনো দেশ ইরানকে সামরিক যন্ত্রাংশ বিক্রি করছিল না। শেষ পর্যন্ত তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কালোবাজার থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ শুরু করে ইরান। অস্ট্রেলিয়া থেকে কিনে আনা বিমানের ইঞ্জিন খানিকটা অদলবদল করে তারা ‘মোহাজির’ ড্রোনে ব্যবহার করে। ২০০৮-০৯ সালে জার্মানির কালোবাজার থেকেও ইঞ্জিন কেনা হয়। সেগুলো খুলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিজেরাই নতুন ইঞ্জিন তৈরি করে ফেলে ইরান। তাদের সবচেয়ে ভয়ংকর ‘শাহেদ ১৩৬’ ড্রোনে ব্যবহৃত ইঞ্জিনটি আসলে জার্মানির তৈরি। ‘আবাবিল-৩’ ড্রোনেও একই ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। এই ইঞ্জিন ইরানের কাছে বিক্রির অভিযোগে জার্মানির আদালতে এক ইরানি ও এক ইরানি বংশোদ্ভূত জার্মান নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।

প্রযুক্তির পেছনে এমন নিবিড় প্রচেস্টার ফলেই ইরান আজ বিশ্বকাঁপানো ড্রোনের মালিক। এখন ইরানের কাছে স্বল্প দূরত্বের ড্রোন যেমন আছে, তেমনি দুই থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোনও রয়েছে। শত্রুর রাডার ফাঁকি দিয়ে নজরদারি চালানোর ড্রোন আছে, আত্মঘাতী (সুইসাইড) ড্রোনও আছে। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতির ধীরগতির ড্রোন যেমন রয়েছে, তেমনি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সমান গতির ড্রোনও রয়েছে।

চল্লিশ বছরের চেষ্টায় ইরান কত ধরনের ড্রোন বানিয়েছে—এর সঠিক তথ্য জানা যায় না। তবে ‘মোহাজির’, ‘আবাবিল’ ছাড়াও ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আরও অন্তত ১৩ ধরনের ড্রোন তৈরি করেছে তারা। যেমন: ফোতরোস, হামায়েস, কামান, কারার, মেরাজ, সারির, নাজির, রাদ, সিরাফ, মাহি, ইয়সির। এগুলোর প্রতিটির আবার আলাদা আলাদা মডেল আছে। ‘শাহেদ’ ড্রোনের কমপক্ষে আটটি মডেলের নাম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাওয়া যায়—শাহেদ-১০১, ১০৭, ১২১, ১২৯, ১৩৬, ১৩১, ১৯১, ১৭১ ও ২৩৮। প্রতিটি ড্রোন ইরানের সামরিক শক্তি বাড়িয়েছে এবং সময়মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বিব্রত অবস্থায় ফেলেছে।

Level 0

আমি মো তানজিল সিরাজ সিরাজ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 2 দিন 6 ঘন্টা যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 5 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।


টিউনস


আরও টিউনস


টিউনারের আরও টিউনস


টিউমেন্টস