
দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ফোল্ডেবল স্মার্টফোনের বাজারে রাজকীয় প্রবেশ করল অ্যাপল। সম্প্রতি অ্যাপল পার্কে এক জমকালো ইভেন্টের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'আইফোন ডুয়ো' (iPhone Duo)। প্রথম দেখাতেই নির্দ্বিধায় বলা যায়, স্যামসাং গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮ (Z Fold 8) এই ক্যাটাগরিতে দারুণ করলেও, অ্যাপল তাদের প্রথম ফোল্ডেবল ফোনেই রীতিমতো বাজিমাত করেছে। প্রিমিয়াম ডিজাইন, নজরকাড়া ডিসপ্লে এবং উদ্ভাবনী সব ফিচারের সমন্বয়ে আইফোন ডুয়ো এককথায় অসাধারণ। 
ডিজাইন ও বিল্ড কোয়ালিটি: পাতলা, কিন্তু মজবুত ফোনটি হাতে নিলেই এর প্রিমিয়াম ফিল আপনাকে মুগ্ধ করবে। ভাঁজ খোলা অবস্থায় এটি অ্যাপলের এযাবৎকালের সবচেয়ে পাতলা আইফোন। তবে পাতলা হওয়া সত্ত্বেও এটি হাতে বেশ মজবুত অনুভূত হয়। এর ফ্রেমটি তৈরি করা হয়েছে মেশিনিং ও পলিশ করা টাইটানিয়াম দিয়ে। সামনে এবং পেছনে উভয় দিকেই রয়েছে সিরামিক শিল্ডের সুরক্ষা। ফোল্ডেবল ফোন হওয়া সত্ত্বেও এতে দেওয়া হয়েছে IP68 রেটিং, যা এটিকে পানি ও ধুলোবালি থেকে সুরক্ষিত রাখবে।
সবচেয়ে বেশি চমক রয়েছে এর হিঞ্জ বা কব্জায়। এতে ১০০টিরও বেশি প্রিসিশন কম্পোনেন্ট এবং মাল্টি-লেয়ার ল্যামিনেশন ডিজাইন ব্যবহার করা হয়েছে। ভেতরে থাকা বিশেষ আঠালো পদার্থ ও ডিজাইনের কারণে এর ডিসপ্লে লেয়ারগুলো ঠিক বইয়ের পাতার মতো মসৃণভাবে কাজ করে। এই পুরো সিস্টেমের নিচে সাপোর্ট হিসেবে রয়েছে শক্তিশালী টাইটানিয়াম প্লেট এবং কার্বন ফাইবার। ফোনটি ‘স্টার হোয়াইট’ এবং ‘নাইট স্কাই’—এই দুটি চমৎকার রঙে বাজারে আসবে।

ডিসপ্লে এবং জাদুকরী 'ক্রিজ' সমাধান আইফোন ডুয়োর ভেতরের মূল ডিসপ্লেটি ৭.৬ ইঞ্চির, যা আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সের চেয়ে ৫০ শতাংশ এবং সাধারণ ১৮ প্রো-এর চেয়ে ৮০ শতাংশ বড়। আর বাইরের কভার স্ক্রিনটি ৫.৪ ইঞ্চির, যা আপনাকে আইফোন ১৮ প্রো-এর স্ক্রিন এরিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা দেবে। ফলে ফোনটি ভাঁজ করা অবস্থায় কোনোভাবেই মনে হবে না যে আপনি ছোট স্ক্রিন ব্যবহার করছেন।
সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ হলো ভেতরের স্ক্রিনে ব্যবহৃত 'ন্যানো-টেক্সচার' ফিনিশ। এটি শুধু আলোর প্রতিফলনই কমায় না, বরং মাস্কলেস লেজার লিথোগ্রাফির সাহায্যে তৈরি কাস্টম মাইক্রো-লেন্স টেক্সচারের কারণে স্ক্রিনটি সম্পূর্ণ ফ্ল্যাট ও ম্যাট থাকে। ফলে ফোল্ডেবল ফোনের সবচেয়ে বড় অস্বস্তি—মাঝখানের 'ক্রিজ' বা ভাঁজ প্রায় চোখেই পড়ে না। অ্যাপল এক্ষেত্রে অন্যান্য সব কোম্পানিকে পেছনে ফেলেছে বললেই চলে। এছাড়া ভেতরের স্ক্রিনের ক্যামেরাটি ডিসপ্লের নিচেই দারুণভাবে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, যা লাইট মোডে প্রায় অদৃশ্য থাকে।

সফটওয়্যার ও মাল্টিটাস্কিংয়ের নতুন রূপ ফোল্ডেবল ফর্ম ফ্যাক্টরের সাথে মানিয়ে নিতে সফটওয়্যারে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে অ্যাপল। দরকারি কন্ট্রোলগুলো স্ক্রিনের পাশে নিয়ে আসা হয়েছে, যাতে সহজেই বুড়ো আঙুলের নাগালে থাকে। হোম স্ক্রিন ডক এখন লম্বালম্বিভাবে বসানো হয়েছে। মাল্টিটাস্কিংয়ের ক্ষেত্রে একই সাথে দুটি অ্যাপ চালানো বা একই অ্যাপ দুবার ওপেন করার সুযোগ রয়েছে। অ্যাপগুলোকে 'পেয়ার' বা জোড়া হিসেবে লক করে রাখার সুবিধাও রয়েছে, ফলে অন্য কাজ করে ফিরে এলেও আগের অ্যাপ দুটি ঠিক সেভাবেই ওপেন হবে।
অর্ধেক ভাঁজ করে রাখলে (টেন্ট মোড) ইউজার ইন্টারফেস স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ক্রিনের সাথে মানিয়ে নেয়। যেমন, নেটফ্লিক্স দেখার সময় ভিডিও উপরে থাকে এবং প্লে-পজ বা অন্যান্য কন্ট্রোলগুলো নিচের অংশে চলে আসে। এমনকি ফোনটি কীভাবে বা কতটুকু কোণে রাখা হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে এর অডিও আউটপুটও পরিবর্তিত হয়। স্ট্যান্ডবাই মোডটি বেডসাইড ক্লক বা অ্যালার্ম হিসেবে চমৎকার কাজ করে।

ক্যামেরা ও কিছু উদ্ভাবনী ফিচার ক্যামেরা সেটআপে রয়েছে ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন মেইন ক্যামেরা এবং আইফোন ১৮ প্রো-এর মতো ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন আল্ট্রাওয়াইড লেন্স। তবে এতে কোনো ডেডিকেটেড টেলিফটো লেন্স নেই, যা এই বাজেটের ফোনে অনেকেই মিস করবেন। বাইরের ডিসপ্লেতে রয়েছে ১২ মেগাপিক্সেলের সেন্টার স্টেজ ক্যামেরা।
সবচেয়ে দারুণ লেগেছে এর ‘স্মার্ট টেক’ ফিচারটি। গ্রুপ ছবি তোলার সময় সবাই প্রস্তুত হলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি তুলে নেবে, তাই আর টাইমার দিয়ে দৌড়ে পজিশন নিতে হবে না! বাচ্চাদের ছবি তোলার সময় তাদের মনোযোগ ধরে রাখতে বাইরের স্ক্রিনে মজাদার অ্যানিমেশন প্লে করার দারুণ একটি ফিচারও রয়েছে। এছাড়া 'ডুয়ো ফেসটাইম'-এর মাধ্যমে আপনার পাশে থাকা অন্য কোনো ব্যক্তি কভার স্ক্রিন ব্যবহার করেই আপনার সাথে ভিডিও কলে যুক্ত হতে পারবেন।
পারফরম্যান্স, ব্যাটারি ও দাম আইফোন ডুয়োতে ব্যবহার করা হয়েছে শক্তিশালী 'এ২০ প্রো' (A20 Pro) চিপ এবং নতুন 'সি২' (C2) মডেম, যা আগের সি১এক্স মডেমের চেয়ে ৫০ শতাংশ দ্রুতগামী এবং ১৫ শতাংশ কম ব্যাটারি খরচ করে। আইফোন ১৭ প্রো-এর তুলনায় এটি টানা পারফরম্যান্সে ৩৫ শতাংশ বেশি কার্যকর। ফোনটির দুই অংশে আলাদা দুটি ব্যাটারি রয়েছে। ভেতরের ডিসপ্লেতে টানা ৩১ ঘণ্টা এবং বাইরের ডিসপ্লেতে ৪৪ ঘণ্টা ভিডিও দেখা যাবে। আর মিলিয়ে ব্যবহার করলে প্রায় ২৪ ঘণ্টার ব্যাকআপ পাওয়া যাবে। ২৫ ওয়াটের ম্যাগসেফ ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের পাশাপাশি তারযুক্ত চার্জারে এটি মাত্র ২০ মিনিটে ৫০ শতাংশ চার্জ হয়ে যায়।
এবছরের শেষের দিকে উভয় ডিসপ্লের জন্যই অ্যাপল পেন্সিল সাপোর্ট নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে কোম্পানিটি।
২৫৬ গিগাবাইট স্টোরেজের বেস ভ্যারিয়েন্টের দাম শুরু হচ্ছে ১, ৯৯৯ ডলার থেকে। এছাড়া ৫১২ গিগাবাইট, ১ টেরাবাইট এবং ২ টেরাবাইটের (যা ৩, ১৯৯ ডলার) অপশনও থাকছে। আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে ফোনটির প্রি-অর্ডার শুরু হবে এবং ২৩ অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসবে আইফোন ডুয়ো।
সব মিলিয়ে, ২ হাজার ডলার দামটা বেশ চড়া হলেও, অনেকেই ভেবেছিলেন এর দাম আড়াই হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে। সেই হিসেবে দাম এবং স্পেসিফিকেশনের অসাধারণ ব্যালেন্সে ফোল্ডেবল ফোনের বাজারে অ্যাপলের এই গ্র্যান্ড এন্ট্রি এককথায় দুর্দান্ত।
আমি নাজমুল ইসলাম আবির। Senior Executive, Digital Marketing & eSports, GIGA-BYTE Technology Co., Ltd., Dhaka, Bangladesh। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 5 বছর 3 মাস যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 11 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।
Apple-এর প্রথম ফোল্ডেবল ফোন iPhone Duo নিয়ে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। 7.6-inch ফোল্ডেবল ডিসপ্লে, A20 Pro চিপসেট এবং প্রিমিয়াম ডিজাইনের কারণে এটি ফোল্ডেবল ফোনের বাজারে Apple-এর বড় পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে। 256GB মডেলের আন্তর্জাতিক দাম $1,999 থেকে শুরু, আর বাংলাদেশে দাম জানতে হলে স্থানীয় বাজারমূল্য দেখে নেওয়া ভালো।
স্থানীয় বাজার মূল্য ও সর্বশেষ দাম জানতে MobileMela ওয়েবসাইটটি ভিজিট করতে পারেন। এখানে বিভিন্ন ফোনের দাম ও স্পেসিফিকেশন সহজেই দেখে তুলনা করা যায়।