ঢাকার জ্যামে সিএনজির জানালা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ফোন টেনে নেওয়া, বাসে ভিড়ের মধ্যে পকেট থেকে ফোন সরে যাওয়া অথবা রিকশা থেকে নামতে গিয়ে ফোন ফেলে আসা, এই তিনটি ঘটনা এখন প্রতিদিনের। কিন্তু ফোন হারানোর পর সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি ফোনের দামের নয়।
আপনার ফোনের ভেতরে থাকে Gmail, Facebook, bKash, Nagad, ব্যাংকের অ্যাপ, জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি ও পরিবারের ছবি। ফোনটি যদি আনলক অবস্থায় হাতছাড়া হয়, তবে আক্রমণকারীর হাতে কয়েক মিনিটেই আপনার পুরো ডিজিটাল পরিচয় চলে যেতে পারে। তাই প্রথম কয়েক মিনিট কী করছেন সেটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই টিউনে আমি ধাপে ধাপে দেখাব ফোন হারানোর ঠিক পর মুহূর্তে কোন কাজটি আগে করবেন, Google এর Find Hub দিয়ে ঠিক কী কী করা যায়, IMEI নম্বর কেন সবচেয়ে জরুরি, বাংলাদেশে NEIR ব্যবস্থায় কীভাবে ফোনটি যাচাই ও রিপোর্ট হয়, থানায় জিডি কীভাবে করবেন এবং সবশেষে চুরির আগেই কোন সেটিংগুলো চালু রাখলে ফোন চোরের কাছে অকেজো ইটের টুকরো হয়ে যায়।
ঝুঁকিটা ঠিক কোথায় সেটি না বুঝলে আপনি ভুল কাজে সময় নষ্ট করবেন। বাস্তবে ঝুঁকি তিন স্তরে ভাগ হয় এবং প্রতিটি স্তরের জন্য আলাদা ব্যবস্থা লাগে।
মজার বিষয় হলো, বেশিরভাগ মানুষ শুধু তৃতীয় স্তর নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, অর্থাৎ ফোনটি ফেরত পাওয়ার চেষ্টায়। অথচ ক্ষতির দিক থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরই অনেক বেশি ভয়ংকর, কারণ টাকা ও পরিচয় ফিরে পাওয়া ফোন ফিরে পাওয়ার চেয়ে অনেক কঠিন।
নিচের ক্রমটি এমনভাবে সাজানো, যাতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি সবার আগে বন্ধ হয়। ঘাবড়ে গিয়ে ক্রম উল্টে ফেলবেন না, কারণ প্রথম কাজটি না করলে বাকি কাজগুলোর কোনো মূল্য থাকে না।
একটি কথা মনে রাখবেন। Erase device একবার দিলে ফোনটির অবস্থান আর জানা যাবে না, কারণ মুছে ফেলার পর ফোনটি আর আপনার অ্যাকাউন্টে সংকেত পাঠায় না। তাই এটি সবার শেষে করবেন, তথ্য বেশি জরুরি হলে অবশ্য আগেই করে ফেলুন।
Google এর যে সেবাটি একসময় Find My Device নামে পরিচিত ছিল, সেটির নাম এখন Find Hub। এটি আলাদা করে ইনস্টল করার দরকার নেই, প্রায় সব Android ফোনে Google Play Services এর সাথেই থাকে। অন্য যেকোনো যন্ত্র থেকে ব্রাউজারে গিয়ে আপনার Google অ্যাকাউন্টে লগইন করলেই এটি ব্যবহার করা যায়।
এখানে অনেকেই ভুল ধারণা রাখেন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও আধুনিক Android ফোন সম্পূর্ণ নীরব থাকে না, কারণ Find Hub একটি বড় নেটওয়ার্কের ওপর ভর করে কাজ করে। আশেপাশে থাকা অন্য Android ফোনগুলো ব্লুটুথ সংকেতের মাধ্যমে আপনার ফোনটির অবস্থান বেনামে জানিয়ে দিতে পারে।
তাই আশা ছেড়ে দেওয়ার আগে কয়েক ঘণ্টা পর পর Find Hub একবার খুলে দেখুন। চোর ফোনটি চালু করে ইন্টারনেটে যুক্ত হলেই আপনি হঠাৎ সংকেত পেয়ে যেতে পারেন। তবে অবস্থান পেলে নিজে গিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা কখনোই করবেন না, তথ্যটি পুলিশকে দিন।
IMEI হলো International Mobile Equipment Identity, অর্থাৎ প্রতিটি মোবাইল যন্ত্রের নিজস্ব ১৫ সংখ্যার পরিচয় নম্বর। এটি সিমের সাথে যুক্ত নয়, যন্ত্রের সাথে যুক্ত। চোর সিম ফেলে দিলেও, ফোন রিসেট করলেও এই নম্বর বদলায় না।
এই কারণেই ফোন উদ্ধারের পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকে IMEI। পুলিশ এই নম্বর দিয়েই খোঁজ করে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই নম্বর দিয়েই ফোনটিকে নেটওয়ার্কে অচল করে দিতে পারে।
আজই একটি কাজ করে রাখুন। আপনার ও পরিবারের সবার ফোনের IMEI নম্বরগুলো লিখে ইমেইলে নিজেকে পাঠিয়ে রাখুন অথবা ক্লাউডে একটি নোটে রাখুন। ফোন হারানোর পর এই নম্বর খুঁজে না পেয়ে বহু মানুষ কিছুই করতে পারেন না।
বাংলাদেশে এখন National Equipment Identity Register বা সংক্ষেপে NEIR নামে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা চালু আছে, যা পরিচালনা করে বিটিআরসি। এখানে দেশের বৈধ মোবাইল যন্ত্রের IMEI তালিকাভুক্ত থাকে এবং হারানো, চুরি হওয়া বা ক্লোন করা যন্ত্র চিহ্নিত করা যায়।
এই ব্যবস্থার সুবিধা হলো, আপনি নিজেই কয়েক সেকেন্ডে যাচাই করে দেখতে পারেন কোনো ফোন বৈধভাবে নিবন্ধিত কি না এবং সেটি চুরি হিসেবে রিপোর্ট করা আছে কি না।
ফোন চুরির পর আরেকটি জরুরি কাজ হলো নিশ্চিত হওয়া, আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের অধীনে অন্য কোনো নম্বর নিবন্ধিত হয়ে যায়নি। এটিও একটি কোড দিয়েই দেখা যায়।
এই তৃতীয় অবস্থাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর এখানেই সাধারণ মানুষের জন্য বড় একটি শিক্ষা আছে। পুরোনো ফোন কেনার আগে অবশ্যই IMEI যাচাই করে নিন, নয়তো চুরি হওয়া ফোন কিনে ফেললে টাকা ও ফোন দুটোই হারাবেন।
জিডি অর্থাৎ সাধারণ ডায়েরি শুধু আইনি নিয়ম রক্ষার জন্য নয়। এটি আপনার হাতে একটি সরকারি নথি এনে দেয়, যা পরে সিম তোলা, বীমার দাবি করা ও যন্ত্র উদ্ধারের প্রতিটি ধাপে কাজে লাগে।
আর্থিক ক্ষতি ঠেকানোর জন্য হাতে সময় খুব কম থাকে, তাই এই কাজটি Find Hub এর ঠিক পরেই করা উচিত। মনে রাখবেন, পিন জানা না থাকলেও চোর অ্যাকাউন্ট রিসেটের চেষ্টা করতে পারে, কারণ সিম তার হাতেই আছে।
একটি বিষয়ে সাবধান থাকুন। হেল্পলাইনে কল করলে কেউ কখনো আপনার পিন বা OTP জানতে চাইবে না। কেউ চাইলে বুঝবেন সেটি প্রতারক, তাই কল করার সময় নম্বরটি নিজে ডায়াল করুন, কারও পাঠানো লিংক বা নম্বরে নয়।
এখন আসি সবচেয়ে কাজের অংশে। উপরের সব কাজ হলো ঘটনার পরের চিকিৎসা, কিন্তু আসল সুরক্ষা তৈরি হয় ঘটনার আগে। Android এ এখন এমন কয়েকটি সুবিধা আছে যা চালু থাকলে ছিনতাইকারীর হাতে ফোনটি প্রায় অকেজো হয়ে যায়।
এই সেটিংগুলো পাবেন Settings এ গিয়ে Google তারপর All services তারপর Theft protection অংশে। কিছু ফোনে এটি Security and privacy এর ভেতরেও থাকতে পারে।
এটি সবচেয়ে চমৎকার সুবিধাটি। ফোনের সেন্সরগুলো যখন হঠাৎ ছোঁ মেরে টেনে নেওয়ার মতো নড়াচড়া বুঝতে পারে এবং এরপর দ্রুত সরে যাওয়ার গতি শনাক্ত করে, তখন ফোনটি নিজে নিজেই সাথে সাথে লক হয়ে যায়। ফলে আনলক অবস্থায় ফোন হাতছাড়া হলেও চোর ভেতরে ঢুকতে পারে না।
চোরেরা এখন প্রথম কাজ হিসেবে ফোনটি ফ্লাইট মোডে দেয় বা সিম খুলে ফেলে, যাতে দূর থেকে লক করা না যায়। এই সুবিধাটি ঠিক সেই চালটি নষ্ট করে দেয়। ফোনটি দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট ছাড়া থাকলে এটি নিজে থেকেই স্ক্রিন লক করে দেয়।
Google অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড মনে না থাকলেও শুধু আপনার ফোন নম্বর দিয়ে যাচাই করে ফোনটি দূর থেকে লক করার ব্যবস্থা এটি। আতঙ্কের মুহূর্তে পাসওয়ার্ড মনে না পড়া খুব স্বাভাবিক, তাই এটি চালু রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে এটি কাজ করতে ফোনটি অনলাইনে থাকা দরকার।
কেউ যদি বারবার ভুল পিন বা প্যাটার্ন দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে, তবে ফোনটি নিজেই কঠোরভাবে লক হয়ে যায় এবং কেবল আসল শনাক্তকরণ ছাড়া আর খোলে না।
এটি নতুন ফোনগুলোতে পাওয়া যায় এবং সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী স্তর। এটি চালু থাকলে আপনার নির্ধারিত বিশ্বস্ত জায়গার বাইরে থাকা অবস্থায় স্পর্শকাতর কোনো কাজ করতে হলে শুধু পিন বা পাসওয়ার্ড দিয়ে কাজ হবে না, আঙুলের ছাপ বা মুখের শনাক্তকরণ বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে।
অর্থাৎ চোর আপনার পিন দেখে ফেললেও Google অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদলাতে পারবে না, ফোনটি রিসেট করে নিজের নামে চালু করতে পারবে না এবং আর্থিক অ্যাপে ঢুকতে পারবে না।
iPhone এর ব্যবস্থাটি আলাদা তবে ধারণাটি একই। এখানে Find My সেবাটি কাজ করে এবং সাথে থাকে Activation Lock, যার কারণে চুরি হওয়া iPhone আপনার Apple অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড ছাড়া নতুন করে চালু করা যায় না।
সাধারণভাবে বন্ধ ফোনের সরাসরি অবস্থান পাওয়া যায় না। তবে শেষ যে জায়গায় সংকেত পাওয়া গিয়েছিল সেটি দেখা যায়, আর কিছু আধুনিক ফোন বন্ধ অবস্থায়ও সীমিত সময় ব্লুটুথ সংকেত পাঠাতে পারে।
রিসেট করলেও IMEI বদলায় না, তাই IMEI দিয়ে অভিযোগ ও যাচাই চালু থাকে। আর Identity Check ও Activation Lock এর মতো সুবিধা চালু থাকলে রিসেট করেও ফোনটি ব্যবহারযোগ্য করা যায় না।
ওয়াইফাই থাকলে কাজ করবে, কারণ Find Hub ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করে, সিমের ওপর নয়। তাই সিম বন্ধ করতে দ্বিধা করবেন না, কারণ OTP আটকানো অনেক বেশি জরুরি।
প্রথমেই IMEI নিয়ে যাচাই করুন যন্ত্রটি চুরি হিসেবে রিপোর্ট করা আছে কি না। সাথে দেখে নিন ফোনটি আগের মালিকের Google বা Apple অ্যাকাউন্ট থেকে সাইন আউট করা হয়েছে কি না।
এটি নির্দিষ্ট Android সংস্করণ ও মডেলে পাওয়া যায় এবং Google Play Services এর মাধ্যমে ছড়ায়। Theft protection অংশে গিয়ে না পেলে বুঝবেন আপনার মডেলে এখনো আসেনি, তখন অন্তত Find Hub ও সিম পিন চালু রাখুন।
ফোন চুরি হওয়া দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু এর পরের ক্ষতিটা প্রায় পুরোপুরি আপনার হাতে। প্রথম কয়েক মিনিটে ফোন লক করা, সিম বন্ধ করা ও আর্থিক অ্যাকাউন্ট আটকে দেওয়া, এই তিনটি কাজ ঠিকভাবে করলে বড় বিপদ প্রায় সব সময়ই এড়ানো যায়।
তার চেয়েও বড় কথা, চুরির আগেই যদি Theft protection এর সেটিংগুলো চালু থাকে, IMEI লিখে রাখা থাকে আর ব্যাকআপ চলতে থাকে, তবে ফোন হারানো নিছক আর্থিক ক্ষতি হয়ে দাঁড়ায়, ডিজিটাল দুর্ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় না।
আজ রাতে ঘুমানোর আগে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দিন। Settings এ গিয়ে Theft protection খুলে দেখুন কোন কোন সুবিধা আপনার ফোনে আছে, আর সেগুলো চালু করে দিন। এরপর নিজের ও পরিবারের সবার ফোনের IMEI নম্বর একটি নোটে লিখে ইমেইলে পাঠিয়ে রাখুন।
আপনার ফোনে Theft Detection Lock ও Identity Check এর মধ্যে কোনটি পেলেন, সেটি টিউমেন্টে জানাবেন। কোন ব্র্যান্ডের কোন মডেলে কী পাওয়া যাচ্ছে, সেই তালিকাটি অন্য টিউডারদের জন্য খুবই কাজে লাগবে।
এই টিউনের সাথে মিলিয়ে পড়ুন ফোনের স্টোরেজ ভরে যায় কেন এবং ফোনের ব্যাটারি হেলথ কেন দ্রুত কমে যায় টিউন দুটি।
আমি নাছিরুল হক। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 3 দিন 1 ঘন্টা যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 19 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।
আমি নাছিরুল হক। প্রোগ্রামিং আর প্রযুক্তি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালোবাসি। টেকটিউনসে মূলত Java প্রোগ্রামিং নিয়ে ধাপে ধাপে হাতে কলমে টিউটোরিয়াল লিখি — JDK ইনস্টল ও এনভায়রনমেন্ট সেটআপ থেকে শুরু করে IntelliJ IDEA, Exception Handling, OOP, Java Swing ও ফাইল হ্যান্ডলিং পর্যন্ত। এছাড়া স্মার্টফোন, ব্যাটারি ও নেটওয়ার্ক নিয়ে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যামূলক...