ফোনের ব্যাটারি হেলথ কেন দ্রুত কমে যায়, লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ভেতরের বিজ্ঞান ও ব্যাটারির আয়ু বাড়ানোর কার্যকর কৌশল

নতুন ফোন কেনার প্রথম কয়েক মাস ব্যাটারি নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকে না। কিন্তু এক বছর পার হতেই দেখা যায় সকালে ফুল চার্জ দেওয়া ফোন বিকেল না গড়াতেই নিভু নিভু করছে। প্রশ্ন হলো, ব্যাটারির ভেতরে ঠিক কী ঘটে যার কারণে ধীরে ধীরে ক্যাপাসিটি কমে যায়, আর আমরা নিজেরা কোন অভ্যাসগুলো বদলালে এই ক্ষয় ধীর করা সম্ভব। এই টিউনে আমি ব্যাটারির ভেতরের রসায়নটা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব এবং তারপর বাস্তবে প্রয়োগ করা যায় এমন কৌশলগুলো নিয়ে আলোচনা করব।

লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি আসলে কীভাবে কাজ করে

আমাদের ফোন, ল্যাপটপ, পাওয়ার ব্যাংক, এমনকি ইলেকট্রিক গাড়ি, সবার ভেতরেই মূলত একই নীতি কাজ করে। ব্যাটারির ভেতরে দুটি প্রধান অংশ থাকে। একটি Anode, যা সাধারণত গ্রাফাইট দিয়ে তৈরি, আর অন্যটি Cathode, যা লিথিয়াম ধাতব অক্সাইডের যৌগ। এই দুইয়ের মাঝে থাকে Electrolyte এবং একটি পাতলা Separator।

চার্জ দেওয়ার সময় লিথিয়াম আয়ন Cathode থেকে বেরিয়ে Electrolyte এর ভেতর দিয়ে Anode এ গিয়ে জমা হয়। আপনি যখন ফোন ব্যবহার করেন, আয়নগুলো আবার উল্টো পথে ফিরে আসে এবং সেই চলাচলের সঙ্গে সঙ্গেই বাইরের সার্কিটে ইলেকট্রন প্রবাহিত হয়। এই ইলেকট্রন প্রবাহই আপনার ডিসপ্লে, প্রসেসর ও ক্যামেরাকে চালায়।

সমস্যা হলো, প্রতিটি চার্জ ও ডিসচার্জে এই যাওয়া আসার পথে কিছু লিথিয়াম আয়ন স্থায়ীভাবে আটকে যায়। Anode এর গায়ে একটি রাসায়নিক আস্তরণ তৈরি হয়, যাকে বলা হয় Solid Electrolyte Interphase। শুরুতে এই আস্তরণ ব্যাটারিকে রক্ষা করে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি ঘন হতে থাকে এবং কার্যকর লিথিয়ামের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। ফলে ব্যাটারি আর আগের মতো চার্জ ধরে রাখতে পারে না।

লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ভেতরে কী ঘটে

ব্যাটারি হেলথ কমার পেছনে মূল কারণগুলো

এক. চার্জ সাইকেল

ব্যাটারির আয়ু গণনা করা হয় Charge Cycle দিয়ে। ১০০ ভাগ চার্জ খরচ হলে সেটি এক সাইকেল। আজ ৫০ ভাগ আর কাল ৫০ ভাগ খরচ করলেও সেটি এক সাইকেলই। বেশিরভাগ ফোনের ব্যাটারি ৫০০ থেকে ৮০০ সাইকেলের পর মূল ক্যাপাসিটির প্রায় ৮০ ভাগে নেমে আসে।

দুই. তাপ

তাপ ব্যাটারির সবচেয়ে বড় শত্রু। উচ্চ তাপমাত্রায় ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বেড়ে যায়, ফলে ক্ষয়ও দ্রুত হয়। গরমে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে ফোন রেখে দেওয়া, বালিশের নিচে রেখে চার্জ দেওয়া, বা ভারী গেম খেলার সময় একসঙ্গে ফাস্ট চার্জিং চালানো, এই তিনটি অভ্যাসই ব্যাটারির আয়ু দ্রুত কমায়।

তিন. ভোল্টেজ স্ট্রেস

ব্যাটারি যখন প্রায় ১০০ ভাগ চার্জ অবস্থায় থাকে, তখন ভেতরের ভোল্টেজ সর্বোচ্চ থাকে এবং সেই অবস্থায় ক্ষয় বেশি হয়। একইভাবে একেবারে শূন্যের কাছে নামিয়ে ফেলাও ক্ষতিকর। এ কারণেই আধুনিক ফোনে Optimized Charging বা 80 Percent Limit এর মতো ফিচার যোগ করা হয়েছে।

চার. ক্যালেন্ডার এজিং

আপনি ব্যবহার না করলেও ব্যাটারি বুড়ো হয়। ড্রয়ারে ফেলে রাখা পুরনো ফোনের ব্যাটারিও ধীরে ধীরে ক্ষমতা হারায়, কারণ ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়া থেমে থাকে না।

ব্যাটারির আয়ু বাড়াতে যা করবেন

  • দৈনন্দিন ব্যবহারে চার্জ ২০ থেকে ৮০ ভাগের ঘরে রাখার চেষ্টা করুন। ফোনে Charging Limit অপশন থাকলে তা চালু রাখুন।
  • চার্জ দেওয়ার সময় মোটা কভার খুলে রাখুন, যাতে তাপ সহজে বের হতে পারে।
  • ভারী গেম বা দীর্ঘ ভিডিও রেকর্ডিংয়ের সময় ফাস্ট চার্জার ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
  • ফোন বা পাওয়ার ব্যাংক দীর্ঘদিন ব্যবহার না করলে প্রায় ৫০ ভাগ চার্জে রেখে ঠান্ডা জায়গায় সংরক্ষণ করুন।
  • অজানা ব্র্যান্ডের সস্তা চার্জারের বদলে ফোনের নির্মাতার অনুমোদিত চার্জার ও কেবল ব্যবহার করুন।
  • ব্যাটারি ফুলে গেলে বা অস্বাভাবিক গরম হলে ব্যবহার বন্ধ করে অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে যান।

ব্যাটারি ভালো রাখার ৬টি সহজ নিয়ম

প্রচলিত যে ধারণাগুলো আসলে ভুল

  • নতুন ফোন প্রথমবার আট ঘণ্টা চার্জ দিতে হয়, এই নিয়ম পুরনো নিকেল ব্যাটারির যুগের। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিতে এর কোনো প্রয়োজন নেই।
  • ব্যাটারি ক্যালিব্রেট করতে প্রতি মাসে শূন্য থেকে শতভাগ চার্জ দেওয়া দরকার, এটিও ঠিক নয়। এতে বরং বাড়তি স্ট্রেস পড়ে। শুধু পার্সেন্টেজ দেখানোয় বড় গরমিল হলে একবার করা যেতে পারে।
  • সারারাত চার্জে রাখলে ব্যাটারি ফেটে যায়, এমন নয়। আধুনিক ফোনে চার্জ পূর্ণ হলে সার্কিট নিজেই কারেন্ট বন্ধ করে। তবে দীর্ঘ সময় শতভাগে থাকার কারণে ধীরে ধীরে ক্ষয় বাড়ে, সমস্যা এখানেই।
  • ব্যাকগ্রাউন্ডের সব অ্যাপ বারবার বন্ধ করলে ব্যাটারি বাঁচে, এটিও ভুল ধারণা। অ্যাপ পুনরায় চালু হতে বেশি শক্তি খরচ হয়।

নিজের ফোনের ব্যাটারি হেলথ কীভাবে দেখবেন

আইফোনে Settings থেকে Battery এবং তারপর Battery Health অংশে গেলে Maximum Capacity দেখা যায়। অ্যান্ড্রয়েডে ব্র্যান্ড অনুযায়ী পথ আলাদা। স্যামসাং ফোনে Samsung Members অ্যাপের Diagnostics অংশে, শাওমিতে Security অ্যাপের ব্যাটারি অংশে তথ্য পাওয়া যায়। অ্যান্ড্রয়েড ১৪ ও এর পরের কিছু ডিভাইসে Settings এর Battery Information অংশে ম্যানুফ্যাকচারিং তারিখ ও সাইকেল কাউন্টও দেখা যায়।

ফাস্ট চার্জিং কি সত্যিই ব্যাটারির আয়ু কমায়

আজকাল ৬৭ ওয়াট বা ১২০ ওয়াটের চার্জার একেবারে সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে, তাই প্রশ্নটা আসা স্বাভাবিক। উত্তরটা হ্যাঁ এবং না, দুটোই। বেশি ওয়াটে চার্জ দিলে ভেতরে বেশি তাপ তৈরি হয় এবং আয়নের চলাচলে বাড়তি চাপ পড়ে, যা ক্ষয়ের গতি কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। তবে ব্র্যান্ডের নিজের চার্জারে চার্জিং কার্ভ এমনভাবে সাজানো থাকে যে শুরুতে পূর্ণ গতিতে চার্জ হয়, আর ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পার হলেই গতি অনেকটা কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ক্ষতির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণেই থাকে।

বাস্তব পরামর্শ হলো, প্রতিদিন সারা রাত ফাস্ট চার্জারে ফোন লাগিয়ে রাখার চেয়ে দিনের বেলা অল্প অল্প করে চার্জ করা ভালো। আর হাতে সময় থাকলে কম ওয়াটের চার্জার ব্যবহার করলে ব্যাটারি তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে, যা দীর্ঘ মেয়াদে উপকার করে।

ব্যাটারি হেলথ কত নামলে বদলানো উচিত

সাধারণভাবে ধরা হয়, Maximum Capacity ৮০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে ব্যাটারি তার কার্যকর জীবনের শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে। এই অবস্থায় নিচের লক্ষণগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে।

  • চার্জ ২০ থেকে ৩০ শতাংশে নামলেই ফোন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া
  • ভারী অ্যাপ বা গেম চালালে ফোন রিস্টার্ট হওয়া বা পারফরম্যান্স হঠাৎ কমে যাওয়া
  • চার্জ হতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগা
  • ব্যাটারি ফুলে যাওয়া, এই ক্ষেত্রে দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাটারি বদলানো জরুরি

ব্যাটারি বদলানোর সময় অবশ্যই অফিসিয়াল সার্ভিস সেন্টার বা নির্ভরযোগ্য দোকান থেকে আসল ব্যাটারি নেওয়া উচিত। সস্তা নকল ব্যাটারিতে সুরক্ষা সার্কিট দুর্বল থাকে, ফলে অতিরিক্ত গরম হওয়া ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়।

শেষ কথা

ব্যাটারির ক্ষয় ঠেকানো যায় না, কারণ এটি রসায়নের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু তাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে, চার্জ মাঝামাঝি রেখে এবং ভালো চার্জার ব্যবহার করে এই ক্ষয়ের গতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এতে ফোনের আয়ু বাড়বে, ই ওয়েস্টও কম তৈরি হবে।

আপনার ফোনের ব্যাটারি হেলথ এখন কত ভাগ, আর কত দিন ব্যবহারের পর সেটি কমতে শুরু করেছে, টিউমেন্টে জানান। কোনো প্রশ্ন থাকলে সেটিও লিখতে পারেন, আমি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।

Level 0

আমি নাছিরুল হক। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 8 ঘন্টা 30 মিনিট যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 3 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।


টিউনস


আরও টিউনস


টিউনারের আরও টিউনস


টিউমেন্টস