
বর্তমানে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্মার্টফোন। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার প্রিয় হ্যান্ডসেটটি বৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে কিনা? অবৈধ বা ক্লোন হ্যান্ডসেটের ব্যবহার বন্ধ করতে এবং গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) চালু করছে National Equipment Identity Register (NEIR)। এই Directive সম্পর্কে টেকটিউনসের এই টিউনে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে আপনার মনে কোনো অস্পষ্টতা না থাকে।

আপনি যখন একটি নতুন স্মার্টফোন কিনতে যান, তখন বিক্রেতা আপনাকে অনেক রঙচঙা কথা বলতে পারেন। কিন্তু সচেতন গ্রাহক হিসেবে আপনার প্রথম কাজ হবে ফোনটির আইএমইআই (IMEI) নম্বর যাচাই করা। মনে রাখবেন, কোনো বিক্রেতা যদি বলে "এটি আনঅফিসিয়াল কিন্তু পরে ঠিক হয়ে যাবে", তবে সেই ফাঁদে পা দেবেন না। আইএমইআই (IMEI) চেক না করে কোনো অবস্থাতেই ফোন কেনা উচিত নয়।
যাচাই করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ এবং সম্পূর্ণ ফ্রি। যেকোনো সচল মোবাইল থেকে মেসেজ অপশনে যান এবং লিখুন:
KYD ১৫ ডিজিটের IMEI নম্বর এবং পাঠিয়ে দিন ১৬০০২ নম্বরে।
ফিরতি SMS-এর মাধ্যমেই আপনি জেনে যাবেন হ্যান্ডসেটটি BTRC ডাটাবেসে নিবন্ধিত আছে কিনা। এমনকি আন্তর্জাতিক বা দেশি ই-কমার্স থেকে ফোন কেনার ক্ষেত্রেও আপনি এই একই পদ্ধতিতে বৈধতা নিশ্চিত করতে পারেন।

রেজিস্ট্রেশন নিয়ে অনেক সময় গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তবে আধুনিক নিয়মে এটি আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে।
আপনি যদি দেশি কোনো শপ থেকে বৈধভাবে আমদানিকৃত বা দেশে উৎপাদিত (যেমন: Samsung, Vivo বা Symphony) হ্যান্ডসেট কেনেন, তবে আপনাকে আলাদা করে কিছুই করতে হবে না। ফোনে আপনার সিম কার্ড ইনসার্ট করার সাথে সাথেই NEIR সিস্টেমে সেটি অটোমেটিক নিবন্ধিত হয়ে যাবে।
NEIR সিস্টেমটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার আগে আপনার হাতে থাকা ফোনটি যদি আনঅফিসিয়াল বা ক্লোনও হয়ে থাকে, তবে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আগের সকল ব্যবহৃত ফোন নেটওয়ার্কে সচল থাকলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাটাবেসে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।
যদি অনেক আগে কেনা কোনো আনঅফিসিয়াল ফোন আপনি NEIR চালুর আগে কোন সিম দিয়ে অ্যাক্টিভ (Active) না করে থাকেন, তবে সেটি আর নিবন্ধনের সুযোগ পাবে না। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র বিদেশ থেকে আনা ফোনের জন্য স্পেশাল রেজিস্ট্রেশন (Special Registration) প্রযোজ্য হবে।

আমাদের প্রবাসী ভাইবোনরা যখন দেশ ফেরেন, তখন প্রিয়জনদের জন্য উপহার হিসেবে প্রায়ই স্মার্টফোন নিয়ে আসেন। এক্ষেত্রে কাস্টমস ও BTRC-র নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়।
সর্বশেষ "অপর্যটক যাত্রী ব্যাগেজ বিধিমালা, ২০২৫" অনুযায়ী, একজন যাত্রী প্রতি বছর সর্বোচ্চ ২ (দুই)টি ব্যবহৃত ফোন এবং ১ (এক)টি নতুন ফোন শুল্ক ছাড়াই আনতে পারবেন। এর বেশি ফোন আনলে প্রচলিত বিধি মোতাবেক শুল্ক প্রদান করতে হবে।
যারা Bureau of Manpower, Employment and Training (BMET) এর নিবন্ধনধারী, তারা ১টি ব্যবহৃত ফোনের পাশাপাশি শুল্ক ছাড়াই আরও ২ (দুই)টি নতুন ফোন এবং শুল্ক দিয়ে আরও ১টি ফোন আনতে পারবেন।
প্রবাসীরা বিদেশ থেকে আনা ফোন রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারবেন। এই সময়ের পর ফোনটি সচল রাখতে অবশ্যই স্পেশাল রেজিস্ট্রেশন (Special Registration) সম্পন্ন করতে হবে।
neir.btrc.gov.bd এর সিটিজেন পোর্টাল (Citizen Portal) এ গিয়ে আপনার NID দিয়ে নিবন্ধিত সিম কার্ডটি হ্যান্ডসেটে ইনসার্ট করে নেটওয়ার্কে সচল করুন। এরপর নিম্নোক্ত ডকুমেন্টগুলোর স্ক্যান বা ফটো আপলোড করে আবেদন করুন:

স্মার্টফোন হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল যন্ত্রটি হারানো নয়, বরং আপনার ব্যক্তিগত তথ্যের বড় ঝুঁকি তৈরি হওয়া। NEIR সিস্টেম এই ঝুঁকি অনেকাংশেই কমিয়ে দিয়েছে।
ফোন হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে প্রথমেই নিকটস্থ থানায় একটি ডায়েরি করুন।
আপনার চুরি যাওয়া ফোনটি অন্য কেউ যাতে ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য আপনি BTRC সিটিজেন পোর্টাল (Citizen Portal), মোবাইল অ্যাপ বা গ্রামীণফোনের কাস্টমার কেয়ার সেন্টারের মাধ্যমে ফোনটি লক (Lock) করে দিতে পারেন। একবার ব্ল্যাক লিস্ট (Black List) এ অন্তর্ভুক্ত হলে ফোনটি বাংলাদেশের কোনো অপারেটরের সিম কার্ড দিয়ে আর চালানো যাবে না।
হারানো ফোন ফিরে পেলে আপনি একই পদ্ধতিতে সেটি আনলক (Unlock) করে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করতে পারবেন। মনে রাখবেন, লক করা ফোন ওয়াই-ফাই (Wi-Fi) নেটওয়ার্কে ব্যবহার করা গেলেও সেলুলার নেটওয়ার্কে সেটি অকেজো হয়ে পড়বে।

একটি হ্যান্ডসেট যখন NEIR এ নিবন্ধিত হয়, তখন সেটি মূলত একটি নির্দিষ্ট NID এর সাথে ট্যাগ হয়ে যায়। ফলে ফোনটি বিক্রি বা উপহার দেওয়ার সময় কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।
আপনি যদি আপনার ফোনটি অন্য কাউকে দিতে চান, তবে অবশ্যই সেটি ডি-রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এজন্য আপনার ফোনে আপনার NID দিয়ে নিবন্ধিত সিম থাকা অবস্থায় *১৬১৬১# ডায়াল করুন। আপনার NID বা SNID এর শেষ ৪টি সংখ্যা দিয়ে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করুন।
অন্যের ব্যবহৃত ফোন কেনার আগে বিক্রেতাকে বলুন ফোনটি ডি-রেজিস্ট্রেশন করে দিতে। ডি-রেজিস্ট্রেশন ছাড়া নতুন সিম কার্ড প্রবেশ করালে আপনি নেটওয়ার্ক অ্যাক্সেস (Access) পাবেন না।
যদি মূল মালিকের মৃত্যু হয়, তবে তারপরিবারের সদস্যরা সেই সিম কার্ডসহ ফোনটি ব্যবহার করতে পারবেন। তবে মালিকানা বদলাতে হলে আগের মতোই ডি-রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজন হবে।

অনেকের ফোনে দুটি আইএমইআই (IMEI) থাকে। এক্ষেত্রে আপনাকে প্রতিটি সিম স্লটের জন্য আলাদাভাবে আবেদন করতে হবে। আবেদন করার আগে নিশ্চিত করুন প্রতিটি স্লটে আপনার নিজের NID দিয়ে নিবন্ধিত সিম কার্ডটি অ্যাক্টিভ আছে।
Corporate SIM ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিস্ট অপারেটর থেকে SMS পাঠিয়ে NID তথ্য আপডেট করতে বলা হবে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত NID অথবা প্রতিষ্ঠানের কী-কন্টাক্ট-পয়েন্ট (KCP) এর NID দিয়ে ডি-রেজিস্ট্রেশন সুবিধা পাওয়া যাবে।
অনেক সময় দেখা যায় একই আইএমইআই সম্বলিত একাধিক সেট বাজারে আছে। এমন ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিক তার ক্রয় রসিদ ও প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি দিয়ে আইএমইআই ক্লেইম (IMEI Claim) এর মাধ্যমে তার ফোনের বৈধতা নিশ্চিত করতে পারবেন।
যাদের ইন্টারনেট সংযোগ নেই, তারা BTRC হেল্পডেস্ক নম্বর ১০০, সংশ্লিস্ট অপারেটর কাস্টমার কেয়ার ১২১ অথবা ইউএসএসডি (USSD) কোড *১৬১৬১# ডায়াল করে সব ধরনের সহায়তা পাওয়া যাবে।
NEIR সিস্টেম চালুর ফলে অবৈধ ফোনের মাধ্যমে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ হবে। আপনি যদি GSMA অনুমোদিত নয় এমন হ্যান্ডসেট কেনেন, তবে সেটি ইনভ্যালিড (Invalid) বা ফলস (False) হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং নেটওয়ার্ক অ্যাক্সেস (Access) পাবে না। তাই নিরাপদ ও বিরামহীন মোবাইল সার্ভিস উপভোগ করতে সবসময় বৈধ হ্যান্ডসেট ব্যবহার করুন।
ডিজিটাল জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে থাকুন নিরাপদ ও আপ-টু-ডেট।
আমি সোহানুর রহমান। সুপ্রিম টিউনার, টেকটিউনস, ঢাকা। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 12 বছর 3 মাস যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 677 টি টিউন ও 200 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 124 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।
কখনো কখনো প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর মত ঘটনা পুরো পৃথিবী বদলে দিতে পারে।