স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কী? এটা কি মানব জীবনের জন্য ক্ষতিকর?

টিউন বিভাগ ইন্টারনেট
প্রকাশিত
জোসস করেছেন
Level 31
সুপ্রিম টিউনার, টেকটিউনস, ঢাকা

আসসালামু আলাইকুম টেকটিউনস কমিউনিটি, কেমন আছেন সবাই? আশা করছি ভাল আছেন। বরাবরেই মত আজকেও চলে এসেছি নতুন টিউন নিয়ে।

আপনারা হয়তো ইতিমধ্যে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এর কথা শুনে থাকবেন। ২০২০ সালে SpaceX, Starlink এর পাইলট প্রোগ্রাম অফিসিয়ালি লঞ্চ করে। পরীক্ষা মূলক ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু পরিবারকে এটি ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয়। অর্ধ মিলিয়ন এতে সাইন আপ করে। প্রাথমিক রিভিউ এর ভিত্তিতে জানা গিয়েছে অধিকাংশ ইউজাররাই এটি ব্যবহার করে সন্তুষ্ট তবে অন্যান্য নতুন প্রযুক্তির মত অনেকেই এটা পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পারে নি।

Starlink ইতিমধ্যে অনেক গুলো স্যাটেলাইট লঞ্চ করেছে। অনেক ইউজার জানতে চায় দাম অনুযায়ী এটা ব্যবহার লাভজনক হবে কিনা এবং স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার কতটা নিরাপদ। তো আজকের এই টিউনে আমরা জানব স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কতটা নিরাপদ এবং অনেক বেশি স্যাটেলাইট লঞ্চ করা ভাল আইডিয়া হবে কিনা?

কেন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এর উৎপত্তি?

আপনার ইন্টারনেট স্পীড কেমন হবে সেটা নির্ভর করবে আপনি কোন জায়গা হতে ব্যবহার করছেন তার উপর। বিশ্বের এমন অনেক জায়গা আছে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেরও এমন অনেক লোকেশন আছে যেখানে ইন্টারনেট অসম্ভব। বিভিন্ন কারণে এমন কিছু স্থান তৈরি হয়েছে যেগুলোকে বলা হয় ইন্টারনেট ব্লাইন্ড স্পট।

আর স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রোভাইডাররা এই সমস্যাটিই সমাধান করতে চায়। তাদের মতে যদি একবার কক্ষপথে পর্যাপ্ত স্যাটেলাইট স্থাপন করা যায় তাহলে বিশ্বজুড়ে আর ইন্টারনেট ব্লাইন্ড স্পট থাকবে না। আর তারই ফলাফল সরূপ Starlink, ১২০০০ স্যাটেলাইট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক গুলো স্যাটেলাইট কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে। স্থাপন করা স্যাটেলাইট গুলো পরীক্ষা নিরীক্ষার পাশাপাশি বেশ কিছু স্যাটেলাইট লঞ্চের শিডিউল ও করা হয়েছে।

স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার কি নিরাপদ?

নতুন এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থায় যেহেতু অনেক গুলো স্যাটেলাইট লঞ্চ করা হবে সুতরাং অনেকে দাবী করছে এটা মানুষের জন্য নিরাপদ নয়। কারণ স্যাটেলাইট থেকে রেডিয়েশন নির্গত হয় যা মানব জাতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

ভাল খবর হচ্ছে প্রতিটি স্যাটেলাইট যে প্রযুক্তি ব্যবহার করবে তা ভাল মত পরীক্ষা করা হচ্ছে। জানা গেছে এই প্রযুক্তিতে ডাটা, রেডিও ওয়েবের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হবে।

রেডিও ওয়েব নতুন কোন প্রযুক্তি না, আমরা স্যাটেলাইট টেলিভিশনে প্রতিদিনই এটি ব্যবহার করছি। SpaceX বলছে, স্যাটেলাইট রেডিয়েশন ব্যাপকভাবে বিচ্ছুরিত হলেও গ্রাউন্ড লেভেলে এর প্রভাব খুবই নগণ্য ফলে এটি মানব জীবনের জন্য কোন হুমকি নয়, যেমনটি স্যাটেলাইট টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও হয় না।

স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কী সিকিউর?

স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে আমরা পরিষ্কার হলাম। এবার আমরা জানব এটি কতটা সিকিউর ইন্টারনেট প্রদান করবে। সিকিউরিটির প্রশ্নে ইতিমধ্যে বিভিন্ন এক্সপার্ট প্রশ্ন তুলেছে। এক্সপার্টদের দাবী স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ডেটা স্থানান্তর হবার সময় সেগুলো বিভিন্ন পক্ষ ম্যানিপুলেট করতে পারে যেহেতু এটা রেডিও ওয়েবের মাধ্যমে যাবে। হতে পারে হ্যাকাররা সহজেই ডাটা কালেক্ট করে ফেলতে পারবে।

তবে সিকিউরিটির প্রশ্নে জানা যায় এই সমস্যা সমাধানে ৩০০ ডলার মূল্যমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা লাগতে পারে। তবে এই ধরনের সমস্যা সব ধরনের ট্রাফিকের ক্ষেত্রে হবে এটাও বলা যায় না। তাছাড়া এনক্রিপ্টেড কানেকশনের মাধ্যমে নিরাপত্তা পাওয়া যেতে পারে। তবে এখানে একটা বিষয় নিশ্চিত যে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট যত জনপ্রিয় হবে সাইবার ক্রিমিনালদের সুযোগও তত বাড়বে।

কক্ষপথে অনেক গুলো স্যাটেলাইট স্থাপনে ঝুঁকি

২০২১ সাল পর্যন্ত, SpaceX, কক্ষপথে ১৭৯১ টি স্যাটেলাইট লঞ্চ করেছে এবং বেশ কিছু স্যাটেলাইট শিডিউলে আছে। আর এই নিয়ে ইতিমধ্যে মানুষ সম্ভাব্য সমস্যা নিয়ে কথা বলছে। এখন পর্যন্ত দুটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। স্থাপন করা স্যাটেলাইট গুলো বেশি উজ্জ্বল হবার কারণে জ্যোতির্বিজ্ঞানী অন্যান্য গ্রহ বা উপগ্রহের পরিষ্কার ছবি তুলতে পারছে না। আরেকটা সমস্যা হচ্ছে অনেক বেশি স্যাটেলাইট হওয়াতে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হতে পারে।

তারার ছবি তুলতে বাধা

Starlink এর স্যাটেলাইট গুলো এস্ট্রোনমি ফটোতে দৃশ্যমান হয়েছে। অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী এটা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তারা বলছেন কিছু কিছু স্যাটেলাইট কক্ষপথে খুব বেশি উজ্জ্বল যা তারার ছবি তুলতে সমস্যা তৈরি করছে।

SpaceX এর জবাবে জানিয়েছে, তারা স্যাটেলাইট গুলো সানসেড এর সাথে লঞ্চ করেছে ফলে তাদের আলো খুব বেশি প্রতিফলিত হবে না। SpaceX এই সমস্যায় একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে যে, স্যাটেলাইট গুলোর উজ্জ্বলতা এতটা কমিয়ে আনবে যে তা খালি চোখে অন্ধকার আকাশে দেখা যাবে না।

SpaceX ইতিমধ্যে তাদের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা পূরণ করতে সমর্থ হয়েছে তবে পুরোপুরি নয়। অনেকের দাবী খালি চোখে আলো দেখা না গেলেও টেলিস্কোপ দিয়ে তা দেখা যাবেই।

স্যাটেলাইট গুলো একে অপরের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে

নাসা বলছে, আকাশে হাজার হাজার স্যাটেলাইট স্থাপনের ফলে তাদের মধ্যে সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়বে। যখন একটি স্যাটেলাইট অন্য একটি স্যাটেলাইটের এক কিলোমিটারের মধ্যে দিয়ে যাবে। আর প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ছয়শ বার এই ধরনের এনকাউন্টার হবে। যেখানে অর্ধেকের বেশি থাকবে SpaceX এর স্যাটেলাইট।

এর আগেও মহাকাশে এমন সংঘর্ষ হয়েছে। এই ধরনের সংঘর্ষের ফলে এমন হতে পারে, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট চালু হবার আগেই অনেক অনেক স্যাটেলাইট কার্যকারিতা হারাতে পারে।

স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কী সফল হবে?

স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে সেইফটি বিষয়টিই কেবল প্রশ্নবিদ্ধ নয়, একই সাথে এটি খরচের তুলনায় কতটা ইফেক্টিভ হবে সেটা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

SpaceX এটার পাইলট প্রোগ্রাম লঞ্চ করে ২০২০ সালে, প্রথম দিকে এর ডিমান্ড ছিল আকাশচুম্বী শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই সাইন আপ করেছিল অর্ধ মিলিয়ন।

তাই বলে পাইলট প্রোগ্রামটি সস্তা ছিল না। কাস্টমাররা যন্ত্রাংশ বাবদ পে করেছিল ৪৯৯ ডলার এবং প্রতি মাসে পে করতো ৯৯ ডলার করে। অধিকাংশ কাস্টমারদের কাছে এটাই বড় সমস্যা মনে হয়েছে। যদিও তারা বলছে পুরোপুরি লঞ্চ করা হলে খরচ কমে আসবে, তবে ততটাও কমবে বলে মনে হয় না।

তাছাড়া তাদের লক্ষ্য এমন জায়গায় পৌঁছানো যেখানে ইন্টারনেট নেই, কিন্তু মজার ব্যাপার হল, সেই সমস্ত জায়গা গুলোতে অধিকাংশ মানুষই নিম্ন আয়ের। তো তারা এই পরিমাণ খরচ বহন করতে পারবে কিনা সেটাও দেখার বিষয়।

স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নতুন কিছু না তবে এর আগে বিশাল স্ক্যালে এটা অফার করা হয় নি সুতরাং এটার ইফেক্টিভনেস নিয়েও সন্দেহ আছে। এটা সাশ্রয়ী হতে হলে কয়েক মিলিয়ন ইউজার থাকতে হবে একই সাথে যথেষ্ট কার্যকর হতে হবে।

স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এর সিগনাল নির্ভর করবে কত কাছে ডিশ স্থাপন করা হয়েছে তার উপর। আর যেসব এরিয়াতে আগে ইন্টারনেট পৌছায় নি সেসব এরিয়াতে এসব ডিশ স্থাপন করা কি আসলেই সম্ভব কিনা সেটাও দেখার বিষয়। এছাড়া যে বিষয় গুলো সাধারণ ইন্টারনেটকে বাধা দিয়েছে, সেগুলো স্যাটেলাইট ইন্টারনেটকে বাধা দেবে না এমন গ্যারান্টিও নেই।

এখন পর্যন্ত যত টুকু জানা গেছে, Starlink এর প্রাথমিক রিভিউ ইতিবাচক, তবে উপরে উল্লেখ্য প্রশ্ন গুলোর জবাব পাওয়া যায় নি। হয়তো জবাবের জন্য কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।

শেষ কথা

স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার নিরাপদ এবং এটা পুরোপুরি সফল হলে ট্র্যাডিশনাল ইন্টারনেট এর অনেক লিমিটেশন চলে যাবে। যদিও কিছু প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলো সমাধান করতে পারলে ভাল কিছু আশা করা যায়। তবে যেমনই হোক এটা সাশ্রয়ী করা তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ, কারণ তা না হলে এর মুল লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।

কক্ষপথে হাজার হাজার স্যাটেলাইট যেকোনো ধরনের সমস্যা তৈরি করতেই পারে একই সাথে সংঘর্ষ হবার ঝুঁকি তো থাকেই।

তো আজকে এই পর্যন্তই পরবর্তী টিউন পর্যন্ত ভাল থাকুন আল্লাহ হাফেজ।

Level 31

আমি সোহানুর রহমান। সুপ্রিম টিউনার, টেকটিউনস, ঢাকা। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 9 বছর যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 587 টি টিউন ও 196 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 87 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।

কখনো কখনো প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর মত ঘটনা পুরো পৃথিবী বদলে দিতে পারে।


টিউনস


আরও টিউনস


টিউনারের আরও টিউনস


টিউমেন্টস