
ইন্টারনেট প্যাকেজে লেখা আছে ২০ Mbps, কিন্তু ঘরের এক কোণে দাঁড়ালে ইউটিউব ভিডিও বাফার করতেই থাকে। রাউটার রিস্টার্ট দিলে কিছুক্ষণ ভালো চলে, তারপর আবার একই অবস্থা। প্রায় প্রতিটি বাসাতেই এই গল্প এক।
মজার বিষয় হলো, এর বেশিরভাগ কারণই ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যা নয়, বরং WiFi নামের রেডিও প্রযুক্তির স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা। এই টিউনে আমি ধাপে ধাপে দেখাব WiFi ভেতরে ঠিক কীভাবে কাজ করে, কেন দূরত্ব বাড়লে গতি কমে, 2.4GHz আর 5GHz এর আসল পার্থক্য কী এবং কোন কোন সেটিং বদলে আপনি নিজেই ঘরের নেটওয়ার্ক অনেকটা ভালো করে ফেলতে পারবেন।
WiFi কোনো জাদু নয়, এটি রেডিও তরঙ্গ। আপনার রাউটার একটি ছোট রেডিও স্টেশনের মতো কাজ করে আর ফোন বা ল্যাপটপ সেই সংকেত ধরে। রেডিও তরঙ্গের দুটি বৈশিষ্ট্য এখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।
এই একটি নিয়ম মাথায় রাখলেই WiFi এর অর্ধেক রহস্য পরিষ্কার হয়ে যায়। কংক্রিটের দেয়াল, লোহার গ্রিল, আয়না, এমনকি অ্যাকুরিয়ামের পানিও সংকেত দুর্বল করে দেয়। কারণ পানি ও ধাতু রেডিও তরঙ্গ শুষে নেয় বা প্রতিফলিত করে।
আজকের প্রায় সব রাউটারই দুটি ব্যান্ডে কাজ করে। অনেকে ভাবেন 5GHz সবসময় ভালো, কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়।
সহজ নিয়ম হলো, রাউটারের কাছাকাছি বসে ভারী কাজ করলে 5GHz ব্যবহার করুন। দূরের ঘরে বা রান্নাঘরে গেলে 2.4GHz অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। নতুন WiFi 6E ও WiFi 7 রাউটারে 6GHz নামের আরেকটি ব্যান্ড যোগ হয়েছে, যেটি আরও দ্রুত কিন্তু দূরত্বের সীমা আরও কম।

ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকলে আপনার আশেপাশে হয়তো দশ পনেরোটি WiFi নেটওয়ার্ক আছে। সবাই যদি একই চ্যানেলে সংকেত পাঠায়, তবে অবস্থাটা হয় একটি ছোট ঘরে দশজন একসাথে চিৎকার করার মতো। সবাই কথা বলছে, কিন্তু কেউ কিছু বুঝছে না।
WiFi এর নিয়ম হলো, একই চ্যানেলে একসাথে দুটি ডিভাইস কথা বলতে পারে না। একজনের কথা শেষ হওয়ার জন্য বাকিদের অপেক্ষা করতে হয়। ভিড় বাড়লে এই অপেক্ষার সময়ও বাড়ে, আর ব্যবহারকারীর কাছে সেটিই মনে হয় ইন্টারনেট স্লো।
অনেকেই রাউটারকে ঘরের এক কোণে, টিভির পেছনে বা মিটারের পাশে ফেলে রাখেন। অথচ রাউটারের অবস্থান বদলালেই কখনো কখনো দ্বিগুণ পার্থক্য তৈরি হয়।

স্পিড টেস্ট অ্যাপে দেখানো সংখ্যা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। কোন সার্ভারে টেস্ট হচ্ছে, ওই মুহূর্তে বাসার আর কে কী ডাউনলোড করছে, আপনার ডিভাইসের WiFi কার্ড কত পুরোনো, সব প্রভাব ফেলে।
একটি বিষয় অনেকেই মেলাতে ভুল করেন। ফোনে যে Link Speed দেখানো হয়, সেটি ফোন থেকে রাউটার পর্যন্ত সংযোগের গতি, ইন্টারনেটের গতি নয়। রাউটার আর ফোনের মধ্যে ৩০০ Mbps দেখালেও ইন্টারনেট প্যাকেজ যদি ২০ Mbps হয়, তবে আপনি ২০ এর বেশি পাবেন না।
WiFi এর একটি কম কথিত বৈশিষ্ট্য হলো, বাতাসের সময়টুকু সব ডিভাইস ভাগ করে নেয়। রাউটার একবারে একটি ডিভাইসের সাথেই কথা বলে, তারপর পরেরটির দিকে যায়। এখন যদি একটি খুব পুরোনো ডিভাইস নেটওয়ার্কে থাকে যেটি কম গতিতে ডেটা নিতে পারে, তবে তার সাথে কথা বলতে রাউটারের বেশি সময় লেগে যায়।
ফলে বাকি সব আধুনিক ডিভাইস সেই সময়টুকু অপেক্ষা করে বসে থাকে। এই কারণেই ঘরে অনেক পুরোনো ফোন, পুরোনো সিসি ক্যামেরা বা পুরোনো প্রিন্টার যুক্ত থাকলে গোটা নেটওয়ার্ক ভারী হয়ে যায়। যেসব ডিভাইস আর ব্যবহার করেন না, সেগুলো নেটওয়ার্ক থেকে সরিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
রাউটারও ছোট আকারের একটি কম্পিউটার। এর ভেতরে সীমিত মেমোরি থাকে এবং কোন ডিভাইস কার সাথে কী সংযোগ চালাচ্ছে তার একটি বড় তালিকা রাখতে হয়। দীর্ঘ সময় চলার পর সেই তালিকা ভরে যায়, মেমোরিতেও চাপ পড়ে, সাথে যন্ত্রটি গরম হয়ে ওঠে।
রিস্টার্ট দিলে সব তালিকা মুছে গিয়ে নতুন করে শুরু হয়, তাই কিছুক্ষণ ভালো চলে। কিন্তু এটি রোগের চিকিৎসা নয়, শুধু উপসর্গ ঢাকা। যদি প্রতিদিনই রিস্টার্ট দিতে হয়, তবে বুঝতে হবে রাউটারটি হয় খুব পুরোনো, নয়তো এতগুলো ডিভাইস সামলানোর সামর্থ্য তার নেই।
ঘরের WiFi খারাপ হওয়ার পেছনে বেশিরভাগ সময় দোষ ইন্টারনেট প্রোভাইডারের নয়, বরং রেডিও তরঙ্গের বাস্তব সীমাবদ্ধতা, চ্যানেলের ভিড় এবং রাউটারের ভুল অবস্থান। এই তিনটি জায়গায় হাত দিলে টাকা খরচ না করেই অনেক ভালো ফল পাওয়া যায়।
আপনার রাউটার কোন ব্যান্ডে চলছে আর কোন চ্যানেলে আছে, আজই একবার দেখে নিন। কোন পরিবর্তনে আপনার নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বেশি ভালো হলো, সেটি টিউমেন্টে জানালে অন্যরাও উপকৃত হবেন।
আমি নাছিরুল হক। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 8 ঘন্টা 30 মিনিট যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 3 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।