
কেন পুরুষরা সম্পর্কের ক্ষেত্রে নীরব হয়ে যায়?
লেখক: আমির হোসেন
এই যে ধরুন, একটা সম্পর্ক, যেখানে দুটো মানুষ একসাথে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। হাসে, কাঁদে, ঝগড়া করে, আবার ভালোবাসায় ডুবে থাকে। কিন্তু হঠাৎ একদিন, এই যে পুরুষটা, যে হয়তো একসময় সব কথা ভাগ করে নিতো, হাসতো গলা ফাটিয়ে, সেই মানুষটাই চুপ করে যায়। কেমন একটা নীরবতা গ্রাস করে তাকে। বুকের ভেতর যেন একটা দেয়াল উঠে যায়। কেন হয় এমন? এই প্রশ্নটা আমার মনে ভীষণভাবে ঘুরপাক খায়। আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আজ আমি আপনাদের রোহন আর দিয়ার গল্পটা শোনাতে চাই। সত্যি বলতে, এই গল্পটা শুধু রোহন বা দিয়ার নয়, এটা আমাদের চারপাশে ঘটে চলা অসংখ্য সম্পর্কেরই প্রতিচ্ছবি।
দিয়া প্রথম দিকে বুঝতেই পারেনি ব্যাপারটা। রোহন, তার স্বামী, যে কিনা অফিস থেকে ফিরেই দিয়ার সাথে সারাদিনের গল্প করত, টুকটাক মজার ঘটনা শোনাতো, সেই মানুষটাই কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। প্রথমে ভেবেছিল কাজের চাপ। অফিসের বসের বকাঝকা। আরে বাবা, ওসব তো হয়ই, তাই না? জীবনেরই একটা অংশ। কিন্তু দিনের পর দিন যখন এই নীরবতা বাড়তে থাকলো, দিয়ার মনের ভেতর কেমন একটা চোরা ভয় বাসা বাঁধলো।
"কী হয়েছে তোমার, রোহন? কিছু বলছো না কেন আজকাল?" দিয়া প্রথম প্রথম নরম সুরে জিজ্ঞেস করত।
রোহন শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত, "কিছু না, দিয়া। ভালো লাগছে না। "
"ভালো লাগছে না মানে? শরীর খারাপ? ডাক্তার দেখাবে?"
"না, শরীর ঠিক আছে। "
আর তারপরই আবার সেই নিশ্ছিদ্র নীরবতা। দিয়া হতাশ হয়ে যেত। কেমন অসহায় লাগতো তার। মনে হতো, এই মানুষটাকে সে কি একেবারেই চেনে না?
আসলে, সম্পর্কের শুরুতে আমরা সবাই কেমন একটা স্বপ্নের ঘোরে থাকি। দু'জন দু'জনকে আবিষ্কার করি, সবকিছুর মধ্যে একটা রোমান্টিক আবেশ থাকে। তখন কথা ফুরোতেই চায় না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যখন জীবন তার আসল রঙ দেখাতে শুরু করে, তখন অনেক মুখোশই খুলে যায়, অনেক অপ্রকাশিত দিক বেরিয়ে আসে।
রোহনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। দিয়া যখন তার জীবনে এসেছিল, রোহন তখন ছিল একটা খোলা বই। তার সব আনন্দ, সব কষ্ট, সব স্বপ্ন দিয়ার সাথে ভাগ করে নিতো। দিয়াও তার সবটা উজাড় করে দিত। কিন্তু আস্তে আস্তে, রোহনের ভেতরে একটা পরিবর্তন আসতে শুরু করল। এই পরিবর্তনটা ওর একার ছিল না, এর পেছনে অনেকগুলো কারণ ছিল। পুরুষদের ভেতরে নীরব হয়ে যাওয়ার কারণগুলো এত সরল নয়, যতটা বাইরে থেকে দেখে মনে হয়।
প্রথমত, আমাদের সমাজে পুরুষদেরকে শেখানো হয়, তারা নাকি ‘শক্ত’ হবে। কাঁধ হবে চওড়া। তারা কান্নাকাটি করবে না। মন খারাপ হলেও মুখে হাসি ধরে রাখবে। আরে বাবা, মানুষ তো! রক্ত-মাংসের তৈরি! তারও তো কষ্ট হয়, মন খারাপ হয়, হতাশা গ্রাস করে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তো শেখানো হয়, "ছেলে হয়ে কাঁদছিস? ছিঃ!" এই যে একটা মানসিক চাপ, এটা আস্তে আস্তে পুরুষদের ভেতরে একটা দেয়াল তৈরি করে দেয়। তারা ভাবে, তাদের দুর্বলতা প্রকাশ করলে কেউ তাদের গুরুত্ব দেবে না, কেউ তাদের সম্মান করবে না। আর এই ভয়টা বড় ভয়ঙ্কর।
রোহনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা এরকমই ছিল। ওর বাবা ছিলেন খুব কড়া মেজাজের মানুষ। রোহন ছোটবেলায় কোনো ব্যাপারে ভয় পেলেই বাবা বলতেন, "ছেলে হয়ে ভয় পাচ্ছিস? কাপুরুষ কোথাকার!" ওর মা হয়তো আদর করে কাছে টেনে নিতেন, কিন্তু বাবার এই কথাটা রোহনের মনের গভীরে কোথাও গেঁথে গিয়েছিল। সে শিখেছিল, দুর্বলতা মানেই পরাজয়। তাই যখন ওর জীবনে কোনো সমস্যা আসতো, সে চেষ্টা করত নিজেই সমাধান করতে। দিয়াকে বলতে চাইতো না। ভাবত, বললে দিয়া হয়তো তাকে দুর্বল ভাববে, কিংবা হয়তো দিয়াও সমাধান করতে পারবে না, উল্টে দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে। এই যে ‘নিজের কাঁধে সব দায়িত্ব নেওয়ার’ একটা অলিখিত চাপ, এটা অনেক পুরুষকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়।
একদিন অফিসের একটা বড় প্রজেক্টে রোহনের দারুণ ক্ষতি হয়ে গেল। তার উপর পুরো টিমের দায়ভার ছিল। বস তো তাকে ভালোমতোই ধুয়ে দিলেন। রোহন ভেঙে পড়েছিল সেদিন। কিন্তু বাড়ি ফিরে দিয়ার সামনে কেমন একটা পাথরের মূর্তির মতো বসেছিল। দিয়া জিজ্ঞেস করেছিল, "কী হয়েছে? মুখটা এমন কেন?"
রোহন বলেছিল, "কিছু না। কাজের চাপ। "
দিয়া চেষ্টা করেছিল আরও গভীরে যেতে, "আমি জানি তোমার কিছু হয়েছে। আমায় বলো না প্লিজ। "
রোহন শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। ওর মনে হয়েছিল, এই কথাটা দিয়াকে বলার দরকার নেই। বললে দিয়াও কষ্ট পাবে। আর কী হবে বলে? দিয়া কি আর প্রজেক্টটা ঠিক করে দিতে পারবে? বরং, ওর মনে হচ্ছিল, এই ব্যর্থতার কথা বললে দিয়াও হয়তো তাকে আর আগের মতো 'সফল' বা 'সক্ষম' ভাববে না। এই ভয়টা, এই বিচার হওয়ার ভয়টা অনেক পুরুষকে চুপ করিয়ে দেয়।
সত্যি বলতে, পুরুষরা অনেক সময় নিজেরা নিজেদের মধ্যে সবকিছু গুটিয়ে রাখে, কারণ তারা মনে করে, তাদের আবেগ প্রকাশ করলে বা সমস্যার কথা বললে, তাদের ক্ষমতা কমে যাবে। এই যে সমাজে একটা ধারণা আছে, পুরুষ মানেই সে হবে সমস্যা সমাধানকারী, সে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হবে না – এই ধারণাটা আসলে পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুব ক্ষতিকর। একজন পুরুষ যখন কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না, তখন সে আরও বেশি ভেতরে গুটিয়ে যায়। ভাবে, সে ব্যর্থ।
আরেকটা কারণ আছে, যেটা আমার মনে হয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় পুরুষরা নীরব হয়ে যায়, কারণ তারা মনে করে তাদের কথা শোনা হয় না। কিংবা তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। দিয়া হয়তো রোহনকে অনেক কথা বলত। তার দিনের বকেয়া, তার বন্ধুদের গল্প, শপিংয়ের হিসেব। রোহন শুনত মনোযোগ দিয়ে। মাথা নাড়ত। কিন্তু যখন রোহন নিজে কিছু বলতে চাইত, হয়তো দিয়া তখন নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত, বা অন্য কোনো বিষয়ে কথা শুরু করে দিত। এটা বারবার হতে থাকলে পুরুষদের ভেতরে একটা ধারণা জন্মে যায় যে, "আমার কথা আসলে কেউ শুনতে চায় না। " তখন তারা আর কিছু বলতে চায় না।
একদিন দিয়া খুব সুন্দর একটা রান্না করেছিল। রোহন বাড়ি ফেরার পর দিয়া খুব খুশি হয়ে ওকে খেতে দিল। "কেমন হয়েছে বলো?"
রোহন চুপচাপ খাচ্ছিল। "ভালো হয়েছে। "
"শুধু ভালো? আর কিছু না? আমি এত কষ্ট করে রাঁধলাম, একটা প্রশংসা করতে পারো না?" দিয়া কিছুটা অভিমান করে বলেছিল।
রোহন তখন কী বলবে খুঁজে পাচ্ছিল না। ওর মনে হয়েছিল, "ভালো তো বললামই। আর কী বলতে হবে?" ওর ভেতরে তখন একটা রাগ কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, দিয়া যেন সবসময়ই ওকে ভুল বোঝে। আর এই ভুল বোঝাবুঝির কারণে সে আরও বেশি নীরব হয়ে যাচ্ছিল। কারণ, সে যা-ই বলত, দিয়া সেটাকে অন্যভাবে নিত। তখন মনে হতো, চুপ করে থাকাই ভালো। অন্তত ভুল বোঝাবুঝি তো হবে না!
এই যে যোগাযোগে ভুল বোঝাবুঝি, এটা সম্পর্ককে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়। পুরুষরা যখন দেখে যে তাদের কথাগুলো ঠিকমতো গ্রহণ করা হচ্ছে না, বা তাদের অনুভূতিগুলোকে ছোট করে দেখা হচ্ছে, তখন তারা আর চেষ্টা করতে চায় না। তারা ভাবে, "বলে কী লাভ? যা বলার ছিল, সেটা তো বোঝেনি। " এই জায়গা থেকে একটা দূরত্ব তৈরি হয়। সেই দূরত্ব থেকেই নীরবতা জন্ম নেয়।
আমার মনে হয়, পুরুষদের নীরব হয়ে যাওয়ার পেছনে আরও একটা গভীর কারণ আছে – তারা অনেক সময় জানেই না কীভাবে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে হয়। ছোটবেলা থেকে তাদের শেখানো হয় না যে, রাগ, দুঃখ, হতাশা, ভয় – এগুলো সব স্বাভাবিক অনুভূতি। এগুলো প্রকাশ করা দুর্বলতা নয়, বরং মানবীয় গুণ। ছেলেরা যখন ছোটবেলায় কোনো কিছু নিয়ে কষ্ট পেতো, হয়তো তাদের বলা হতো, "ধুর, এটা কোনো কষ্টের ব্যাপার হলো? ছেলেরা কি এসব নিয়ে মন খারাপ করে?" এই যে একটা বার্তা, এটা তাদের মনের মধ্যে এমনভাবে ঢুকে যায় যে, তারা বড় হয়েও নিজেদের অনুভূতিকে চিনে উঠতে পারে না, বা চিনলেও সেগুলোকে দমন করে রাখে।
রোহনের ক্ষেত্রেও এটা হয়েছিল। ওর মা যখন মারা যান, রোহন তখন কলেজ ফাইনাল ইয়ারে। ওর বাবা ওকে কাঁদতে দেননি। বলেছিলেন, "তোর মা তোকে শক্ত দেখতে চাইতেন। তুই কাঁদলে তোর মা আরও কষ্ট পাবেন। " রোহন সেদিন থেকেই একটা পাথরের মতো হয়ে গিয়েছিল। ভেতরে ভেতরে কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু এক ফোঁটাও কাঁদতে পারেনি। সেই থেকে তার মনের মধ্যে একটা প্যাটার্ন তৈরি হয়ে গিয়েছিল – কষ্ট পেলে সেটাকে লুকিয়ে রাখতে হবে। দুর্বলতা দেখানো যাবে না।
তাই যখন দিয়া ওকে কিছু নিয়ে খোঁচা দিতো, বা যখন কোনো বিষয়ে রোহনের মন খারাপ হতো, সে ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেতো, কিন্তু সেটা দিয়াকে বোঝাতে পারত না। চেষ্টা করলেও সঠিক শব্দ খুঁজে পেতো না। কারণ, সে তো কখনো শিখেইনি নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে ভাষায় প্রকাশ করতে। যখন সে দেখত, দিয়া হয়তো তার কথা বুঝতে পারছে না, তখন সে আরও বেশি করে চুপ হয়ে যেত।
আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করবেন। পুরুষরা অনেক সময় সমস্যা সমাধানের দিকে বেশি মনোযোগী হয়, সম্পর্কের আবেগীয় দিকটা তাদের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। ধরুন, দিয়া যখন কোনো সমস্যা নিয়ে রোহনের কাছে যেত, রোহন হয়তো সঙ্গে সঙ্গেই সমস্যার সমাধান নিয়ে ভাবতে শুরু করত। দিয়া হয়তো শুধু ওর অনুভূতিগুলো শেয়ার করতে চাইত, একটু সহানুভূতি চাইত। কিন্তু রোহন তখন হয়তো বলত, "আরে বাবা, এটা তো এভাবে করলেই ঠিক হয়ে যাবে। " বা "এত টেনশন নিচ্ছ কেন? আমি তো আছি। " দিয়া তখন ভাবত, "এই লোকটা আমার কথা শুনছে না, আমার কষ্টটা বুঝতে চাইছে না। " আর রোহন ভাবত, "আমি তো সমস্যাটা সমাধান করে দিচ্ছি, আর কী চাইবে?"
এই যে দুটো ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, এটা অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয়। পুরুষরা মনে করে, তারা যখন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে, তখন তারা সঙ্গীর প্রতি যত্নশীল। আর মেয়েরা মনে করে, তাদের অনুভূতিগুলোকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। এই কারণেও পুরুষরা অনেক সময় নীরব হয়ে যায়। কারণ তারা ভাবে, "আমি তো সমাধান দিতে চাইছি, কিন্তু সে তো অন্য কিছু চাইছে। তাহলে কথা বলে লাভ কী?"
কিছুদিন আগে অর্জুন কাকার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। অর্জুন কাকা রোহনের বাবার খুব ভালো বন্ধু। তিনি আমাকে বলেছিলেন, "জানিস, আমাদের সময়ে ছেলেদের তো এসব শেখানোই হতো না। রাগ, কষ্ট, অভিমান – এসব ছেলেদের দেখাতে নেই। লোকে কী বলবে? দুর্বল ভাববে। তাই ছেলেরা বড় হয়েও নিজেদের আবেগগুলোকে কেমন একটা লোহার সিন্দুকের ভেতর তালাবন্ধ করে রাখে। চাবিটাও যেন হারিয়ে ফেলে। তখন সম্পর্কগুলোতে নীরবতা চলে আসে। "
অর্জুন কাকার কথাগুলো আমার মনে খুব লেগেছিল। হ্যাঁ, ঠিকই তো! সমাজ আমাদের যেভাবে তৈরি করে, সেটা আমাদের সম্পর্কের ওপর বিরাট প্রভাব ফেলে। পুরুষদেরকে শেখানো হয়, তারা হবে পরিবারের ‘প্রধান’, ‘রক্ষক’। তাদের কোনো দুর্বলতা থাকতে নেই। এই যে একটা চাপ, এটা অনেক সময় পুরুষদেরকে এতটাই বিচ্ছিন্ন করে দেয় যে, তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না যে, তারা কেন চুপ করে যাচ্ছে।
তারপর ধরুন, সম্পর্কের মধ্যে যখন বারবার একই ধরনের ঝগড়া হয়, তখনও পুরুষরা নীরব হয়ে যায়। দিয়া আর রোহনের ক্ষেত্রেও এটা ঘটত। একই বিষয় নিয়ে বারবার ঝগড়া। দিয়া হয়তো বলত, "তুমি আমায় সময় দাও না। " রোহন হয়তো যুক্তি দিত, "আরে বাবা, আমি তো রোজ অফিস থেকে ফিরে তোমার সাথেই থাকি। " দিয়া আবার বলত, "থাকি মানে? তুমি তো মোবাইলে গেম খেলো বা ল্যাপটপে কাজ করো। " এই যে একঘেয়ে ঝগড়া, যেখানে কোনো সমাধান হয় না, তখন পুরুষরা ক্লান্ত হয়ে যায়। তারা ভাবে, "বলে কী লাভ? যা বলব, সেটা তো মানবে না। উল্টে আবার ঝগড়া শুরু হবে। " তখন তারা নিজেদেরকে গুটিয়ে নেয়। নীরবতা তাদের কাছে একটা আত্মরক্ষার ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
দিয়া একদিন রোহনকে জোর করে একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে দিয়ার এক বান্ধবীর স্বামী, রঞ্জন, তার স্ত্রীকে নিয়ে খুব মজা করছিল। রঞ্জন তার স্ত্রীর হাত ধরে দাঁড়িয়েছিল, খুনসুটি করছিল। দিয়া সেই দৃশ্যটা দেখে রোহনের দিকে তাকিয়েছিল। রোহন তখন মোবাইলে কিছু একটা দেখছিল। দিয়া কষ্ট পেয়েছিল। "তুমি একটু রঞ্জনের কাছ থেকে শেখো! কীভাবে স্ত্রীকে সময় দিতে হয়!" দিয়া ফিসফিস করে রোহনকে বলেছিল।
রোহন ফোনটা রেখে বিরক্ত হয়ে বলেছিল, "ওরা কি বাচ্চা নাকি? হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে?"
দিয়া চুপ করে গিয়েছিল। ওর মনে হয়েছিল, রোহন ওকে কখনোই বুঝবে না। আর রোহনের মনে হয়েছিল, দিয়া ওকে সবার সামনে ছোট করছে। এই যে ভুল বোঝাবুঝি, এই যে না বলা কথাগুলো, এইগুলোই তাদের সম্পর্ককে একটা অদৃশ্য দেয়ালে ঘিরে ফেলছিল।
আমি মনে করি, পুরুষরা যখন নীরব হয়ে যায়, তখন তাদের ভেতরে অনেক কথা জমে থাকে। হয়তো তারা ভয় পায়, হতাশ হয়, লজ্জিত হয়। কিন্তু সেগুলো প্রকাশ করতে পারে না। তারা হয়তো চায় তাদের কথা শোনা হোক, তাদের কষ্ট বোঝা হোক। কিন্তু কীভাবে বলবে, সেই পথটা তারা খুঁজে পায় না। আর আমাদের সমাজ তাদের সেই পথটা দেখায়ও না। উল্টে, তাদের আরও বেশি করে পাথর করে দেয়।
তাহলে কি কোনো উপায় নেই? সম্পর্কগুলো কি এভাবেই নীরবতার অতলে হারিয়ে যাবে? আমার মনে হয় না। আমার মনে হয়, দু'জনকেই চেষ্টা করতে হবে। দিয়াকে যেমন বুঝতে হবে যে, রোহনের নীরবতা হয়তো তার কোনো দুর্বলতা নয়, হয়তো তার ভেতরের অনেক জটিলতার প্রকাশ, তেমনই রোহনকেও শিখতে হবে যে, নীরবতা কোনো সমাধান নয়। বরং, সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কথা বলতে হবে। নিজেকে প্রকাশ করতে হবে।
একবার দিয়া রোহনকে চিঠি লিখেছিল। ছোট ছোট করে তার মনের কথাগুলো। "আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো। কিন্তু তোমার এই নীরবতা আমাকে কষ্ট দেয়। আমি তোমার পাশে থাকতে চাই। তোমার সব সমস্যা ভাগ করে নিতে চাই। তুমি আমায় বিশ্বাস করো। "
চিঠিটা পড়ে রোহন অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। ওর চোখ ভিজে এসেছিল। ওর মনে হয়েছিল, দিয়া ওকে ভুল বোঝেনি। দিয়া তার পাশে থাকতে চায়। সেই দিন রোহন প্রথমবার দিয়ার হাত ধরেছিল এবং বলেছিল, "আমি ভয় পাচ্ছিলাম, দিয়া। আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে আমি ব্যর্থ হলে তুমিও কষ্ট পাবে। আমি চাইনি তুমি আমার ব্যর্থতাগুলো দেখ। "
দিয়া ওকে জড়িয়ে ধরেছিল। "তোমার ব্যর্থতাও আমার, রোহন। তোমার কষ্টও আমার। তুমি একা নও। "
আমার মনে হয়, এই বিশ্বাসটাই আসল। এই যে জানার সাহস, যে, "আমি দুর্বল হলেও আমার সঙ্গী আমাকে ভালোবাসবে, আমাকে ছেড়ে যাবে না, আমাকে বিচার করবে না, " এই সাহসটাই অনেক পুরুষকে নীরবতার দেয়াল ভাঙতে সাহায্য করে।
এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। রাতারাতি নীরবতার দেয়াল ভেঙে যায় না। পুরুষদের নিজেদেরও শিখতে হবে যে, আবেগ প্রকাশ করা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং একটা শক্তি। আর সঙ্গিনীদেরও শিখতে হবে যে, তাদের পুরুষ সঙ্গীর নীরবতা মানেই ভালোবাসা কমে যাওয়া নয়, বরং হতে পারে তাদের ভেতরের কোনো না বলা কষ্ট, কোনো ভয়, বা সমাজের চাপ। সহানুভূতি আর বোঝাপড়াই পারে এই দেয়াল ভাঙতে।
আমরা পুরুষদের কাছ থেকে অনেক কিছু আশাকরি। তারা শক্ত হবে, দায়িত্বশীল হবে, সবকিছু সামলে নেবে। কিন্তু আমরা কি কখনো তাদের ভেতরের মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করি? তাদের ভেতরের কষ্টগুলোকে, ভয়গুলোকে? আমার মনে হয়, না। আর তাই, অনেক পুরুষ নীরব হয়ে যায়। কারণ তারা জানে না, কীভাবে কথা বলতে হয়, এবং তাদের কথা শুনবে কে।
সত্যি বলতে, এই গল্পটা লেখার সময় আমার মনের মধ্যে অনেক স্মৃতি উঁকি দিচ্ছিল। আমার নিজের জীবনেও এমন অনেক পুরুষকে দেখেছি, যারা সম্পর্কের ভেতর কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে। আমার এক মামা ছিলেন। সারাজীবন দেখতাম ভীষণ হাসিখুশি মানুষ। কিন্তু যখন মামীর সাথে তার সম্পর্কটা কেমন যেন তিক্ত হয়ে গেল, মামা কেমন একটা চুপচাপ হয়ে গেলেন। কোনো কথা বলতেন না। সবাই বলত, "মামা কেমন বুড়ো হয়ে গেছেন। " কিন্তু আমি জানি, বুড়ো তিনি হননি, তিনি আসলে ভেতরে ভেতরে ভেঙে গেছিলেন। কিন্তু প্রকাশ করতে পারেননি।
এই যে সমাজের একটা অদ্ভুত নিয়ম, যেখানে পুরুষদের আবেগ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয় না, এটাই সব সমস্যার মূলে। আমাদের শেখাতে হবে যে, কান্নাকাটি করা দোষের নয়। মন খারাপ হলে বলতে পারাও একটা শক্তি। দুর্বলতা প্রকাশ করা মানেই যে কেউ তোমাকে ছোট ভাববে, এমনটা নয়। বরং, একজন মানুষ যখন তার দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারে, তখনই সে আসলে সত্যিকারের শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
রোহন আর দিয়ার গল্পে শেষ পর্যন্ত তারা একটা নতুন পথ খুঁজে পেয়েছিল। রোহন ধীরে ধীরে কথা বলতে শিখেছিল। দিয়াও ধৈর্য ধরেছিল। সম্পর্কটা তাদের নীরবতার দেয়াল ভেঙেছিল, কারণ দিয়া ওর পাশে দাঁড়িয়েছিল, আর রোহনও নিজের ভেতরের দেয়ালটা ভাঙার চেষ্টা করেছিল। এটা একটা যাত্রা, একটা নিরন্তর প্রচেষ্টা।
আমার মনে হয়, প্রত্যেক পুরুষ আর নারীকে এই প্রশ্নটা নিজেদেরকে করা উচিত – কেন আমার সঙ্গী নীরব হয়ে যায়? আর সেই নীরবতার পেছনের কারণগুলো খুঁজে বের করা উচিত। তবেই হয়তো অনেক সম্পর্ক বেঁচে যাবে, অনেক না বলা কথা মুখ খুঁজে পাবে। আর এই নীরবতার অভিশাপ থেকে সম্পর্কগুলো মুক্তি পাবে।
"হে পুরুষ, শোনো সম্পর্কের সেইসব কথা, যা কেউ বলেনি"
এই বইটির মাধ্যমে আমরা নিজেদের সেই সব অভ্যাসগুলোকে চিনে নিই, যা আমাদের অজান্তেই আমাদের প্রিয় মানুষদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বইটি খুব শীঘ্রই আসছে! প্রি-অর্ডারের বিস্তারিত জানতে আমাদের ওয়েটিং লিস্টে যুক্ত হোন: এক্সক্লুসিভ ওয়েটিং লিস্ট যুক্ত হোন
আমি আমির হোসেন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 7 মাস 2 সপ্তাহ যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 6 টি টিউন ও 3 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 1 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 5 টিউনারকে ফলো করি।
বই পড়া খুব পছন্দ আমার ।