[মিরর টিউন] আমার ছোটবেলা…. [২য়-পর্ব] ….আজ আমি মেঘনাদ সাহা বলছি….

মিরর টিউনস - আমার ছেলেবেলা

*
1

ঢাকা জেলার (অখণ্ড ভারতের)শেওড়াতলি গ্রামের বাসিন্দা জগন্নাথ সাহা চেয়েছিলেন বর্ণপরিচয় শেষ করলে তাঁর পঞ্চম শিশুপুত্র...মানে আমাকে(মেঘনাদ সাহা) বসিয়ে দেবেন তাঁর মুদির দোকানে...
আমার মা ভুবনেশ্বরী দেবীরও তাই ইচ্ছে ছিল...মানে আমি মুদির দোকানে বসি...
তার একটা কারণ ছিল...অভাবের সংসারে....কোন রকমে দিন কাটে..বেশি পড়াশুনা শিখিয়ে লাভ কি..??
কারণ আমার পিতা-মাতাকে যথেষ্ট পরিশ্রম করে সংসার চালাতে হতো..

#

আমার(মেঘনাদ সাহা) বয়স তখন পাঁচ বছর....দুচোখ ভরে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন..লেখাপড়া শেখার কতো ইচ্ছে..
আর আমার বাবা জগন্নাথ সাহা আমাকে বসিয়ে দিলেন মুদির দোকানে..ভাবলেন দুটো পয়সা রোজগার হবে..

#

মানুষ এক ভাবে ........আর উপ-ওয়ালা করেন এক..আমি (মেঘনাদ সাহা)মুদির দোকানে বসলাম ঠিকই,কিন্তু মন পড়ে থাকলো অজানাকে জানার....
আমার দাদা জয়নাথ বুঝতে পারল যে আমার দ্বারা মুদির দোকান চালানো যাবে না....দাদাই প্রথম বাবাকে বলল... ভাইএর মুদির দোকানে থেকে কাজ নেই..ও বরং পড়াশুনা করুক..
বাবাও রাজি হলেন...বাড়ি থেকে ১২-১৩ কিলোমিটার দূরে শিমুলিয়া মিডিল ইংলিশ স্কুল..দাদা জয়নাথ মা-বাবাকে রাজি করিয়ে সেই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন...
কিন্তু প্রতিদিন ২৪-২৬ কিলোমিটার যেতে আসতে পারবো তো..?এই বয়সে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়াল এই সমস্যা..

#

সব অঞ্চলেই তো কিছু ভালো মানুষ থাকেন...শিমুলিয়াতেই ছিল..এমনই একজন পরোপকারী মানুষ ..তিনি আবার পেশায় ডাক্তার...
তিনিই আমার সমস্ত দ্বায়িত্ব নিলেন..আমার দাদা ডাক্তার বাবুর বাড়িতে থাকার সমস্ত ব্যবস্থা করে দিলেন..

আমি(মেঘনাদ সাহা) কিন্তু ডাক্তার বাবুর বাড়িতে শুধু লেখাপড়া নিয়েই থাকতাম না..আমাকে বাসন মাজা,গরু চরানো,খড়-বিচুলি কাটা ও অন্যান্য গৃহস্থলির কাজও করতে হতো..
আমি কিন্তু এতে কিছু মনে করতাম না...

এত কিছুর মধ্য দিয়ে আমি পড়া শুনো চালিয়ে নিয়ে গেলাম..মাইনর পরীক্ষায় ঢাকা জেলায় প্রথম হলাম..বৃত্তিও পেলাম..মাসে ৪টাকা করে চার বছর..এতে পড়াশুনো চালানোর সুবিধা হলো..
এরপর আমি (মেঘনাদ সাহা)ভর্তি হলাম ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে...আমি সেখানে সপ্তম শেণীতে ভর্তি হলাম...

#

আমার মনে আছে সেই সময় চলছে দেশ জুড়ে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন..ইংরেজদের যথেচ্ছ অত্যাচার..প্রতিবাদে দেশজুড়ে আন্দোলন..বিক্ষোভ কারীদের দলে দলে জেলে ভরছে অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকার..
আমি (মেঘনাদ সাহা)সেই দিনই মনঃস্থির করলাম আমি এর প্রতিবাদ জানাবো..আমার মতন করে...
প্রতিক্ষা শেষে একটি দিন এলো...সেইদিন আমার স্কুলে এলেন ছোটলাট ব্যাসফিল্ড...স্কুল থেকে ছাত্রদের অভিন্দন জানানোর কথা..কিন্তু আমি সেই দিন স্কুলে যায় নি..আমার কিছু সহপাঠীও আমার সাথে প্রতিবাদ জানিয়ে ছিল..

ইংরেজ সরকার আমাদের মানে প্রতিবাদী ছাত্রদের দেখে চটে গেলেন..কঠিন শাস্তি দিনেল আমাদের..স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিলেন..বন্ধ করে দেওয়া হলো আমার স্কলারশিপ...
এই ঘটনা কিন্তু আমাকে দমাতে পারেনি..বরং বীরত্বের আগুন জ্জ্বলে উঠল...অনেকেই মাফ চেয়ে সেই স্কুলে রয়ে গেল....আমি (মেঘনাদ সাহা)কিন্তু মাথা নত করলাম না..অন্যায়ের সাথে আপোস করলাম না..

কিন্তু আমার এই কাণ্ডে আমার দাদা জয়নাথ বিপদে পড়লেন..তাকে আবার ভাবতে হলো আমাকে কোন স্কুলে ভর্তি করবেন..শেষে আমাকে ভর্তি করলেন কিশোরীলাল জুবিলি স্কুলে..এটি একটি বেসরকারী স্কুল..
আমি যেখানে যাব সেখানেই আমার ফলাফল ভালো হবেই..এটা আমার আত্মঅহংকার নয়..আমি(মেঘনাদ সাহা) বার বার প্রমাণ করি আমার অধ্যাবসায়ের দ্বারা..আমি কিশোরীলাল জুবিলি স্কুলেও বৃত্তি পেলাম..এবং বিনাবেতনে পড়াশুনার সুযোগ পেলাম অতিরিক্ত মেধার জন্য..

#

আমি (মেঘনাদ সাহা)স্কুলে পড়ার সময়ই আমার খুব ইচ্ছা করলো নিখিল বঙ্গ বাইবেল পরীক্ষায় বসার..যেমন ইচ্ছা তেমন কর্ম..পরীক্ষায় প্রথম হলাম..সেই সময়ে একশত টাকা ও একটা বাইবেল উপহার পেলাম..
এর কিছুদিন পরে বাংলায় হইচই পড়ে গেল..জুবিলি স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম হলাম..সব বিষয়ে সকলের থেকে বেশি নম্বর পেলাম..অঙ্কে পেলাম ১০০ তে একশ ..এই অসাধারণ ফলাফলের জন্য পঁচিশ টাকা করে বৃত্তি পেলাম এক বছর ধরে..

#

সত্যি কথা বলতে কি..আমার এই সাফল্যের জন্য একমাত্র আমার দাদা..আমার দাদা শ্রদ্ধেয় জয়নাথ এগিয়ে যদি না না আসত তাহলো আমি কখনোই বিজ্ঞানী মেঘনাদ হতে পারতাম না..তাই এই রকম দাদা খুব কম জনার ভাগ্যে জোটে..আমার জন্ম সার্থক.আমি যেন জম্ম জন্মান্তর ধরে এই রকম দাদা পেয়ে থাকি..
ও ..একটা মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছি দাদার কথা ও নিজের কথা বলতে গিয়ে..
আমার জম্ম দিনের কথা বলতে ভুলে গিয়েছি..আমি (মেঘনাদ সাহা) ৬ অক্টোবর ১৮৯৩ সালে জন্ম গ্রহন করি..

শৈশব কলে সবাই খেলা ধূলা করতে ভালোবাসে..পাখি ধরতে ভালোবাসে..ঘুড়ি ওড়াতে ভালোবাসে..আমি (মেঘনাদ সাহা)কিন্তু এই খেলাধূলা ভালোবাসতাম না..
আমার শুধু ভালো লাগত বই পড়তে..তা যে কোন ধরনের বই হোক না কেন..শিশুকাল থেকে বই আমাকে বন্ধুর মত টানত..

#

১৯০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আই.এস.সি. পড়ার জন্য আমি (মেঘনাদ সাহা)ভরতি হলাম ..
সেখান থেকে পাশ করার পর ১৯১১ সালে আমি ভর্তি হই কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ..আমার গাণিতিক পদার্থ বিজ্ঞানের প্রতি বিশেষ আর্কষন ছিল..১৯১৩ সালে গণিত অনার্সে এর ফল প্রকাশিত হল..সত্যেন্দ্রনাথ বসু হলেন প্রথম..আর আমি হলাম দ্বিতীয়..
এরপর ১৯১৫ সালে এম.এস.সি পরীক্ষায় আমি ধরে ফেললাম সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে..মানে দুজনই প্রথম হলাম...প্রথম হলে কি হবে আমাকে অভাবের তাড়নায় সাইকেলে চেপে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউসনি করতে লাগলাম শ্যমবাজার থেকে ল্যান্সডাউন ভিতর..
১৯১৮ সালে ডি.এস.সি উপাধি লাভ করি..১৯১৯ সালে 'প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ' বৃত্তি পাই..উচ্চতর গবেষনার জন্য ১৯১৯ সালেই ইউরোপ যাই..
নিরলস গবেষণা চালিয়ে জ্যোর্তিবিজ্ঞানে নতুন বিষয় আলোক পাত করেছিলাম তার নাম..'তাপীয় আয়নন তত্ত্ব'..এই আবিষ্কারই আমাকে দেশ বিদেশের খ্যাতি এনে দেয়..

দেশে ফিরে এসে ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হই...১৯২২-১৯৩৮ এই সময় কালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতাম..
আবার ১৯৩৮ সালেই কলকাতা ফিরে এসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হলাম..

#

আমি (মেঘনাদ সাহা)দুটি প্রতিষ্ঠান'ইনস্টিটিউন অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স' এবং 'ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যাল্টিভেশন অব সায়েন্স' এর কর্ণধার ছিলাম...বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদীকে শাসন করে তাকে মানুষের কল্যানমূলক কাজে লাগালো থেকে শুরু করে দামোদর পরিকল্পনাটি আমারই কীর্তি..

2

আমি(মেঘনাদ সাহা) ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পরলোকে গমন করি.............

Level 0

আমি কলকাতা। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 11 বছর 11 মাস যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 23 টি টিউন ও 534 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 2 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান্‌ । নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি, সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।- ---ফেসবুকে আমি http://www.facebook.com/pages/Kolkata-India/100002338894158 আমার ব্লক http://kolkata12345.blogspot.com/


টিউনস


আরও টিউনস


টিউনারের আরও টিউনস


টিউমেন্টস

এই Series চলুক…

    উনি তো দেখছি আমাদের স্কুলেরই ছাত্র…
    আমিও ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে পড়তাম…

    ধন্যবাদ আপনাকেও………..এই পর্ব চলবে………আপনিও যে ওই স্কুলের ছাত্র শুনে ভালো লাগল…..

ভাল লাগল

এরা হল মানুষ।আমাদের অহঙ্কার।

    সত্যি কারের অহংকার……….
    কিন্তু এই জাতীয় টিউন জনপ্রিয় হয় না….তাঁরা মানুষের অন্তরালেই থেকে যান…..
    আমি এই টিউনের মাধ্যমে তাঁদের শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম…………
    শুভেচ্ছা বিনিময়ে কলকাতা

আগে উনার সম্পর্কে জানা ছিলনা , এখন জানলাম ।
পরের পর্বের অপেক্ষায়…………..
আপনার লেখার স্টাইলটা প্রভাষক নামে এক ব্লগার আছে এসবি ব্লগে ঠিক তার মত ।
আপনি কি প্রভাষক ?
ধন্যবাদ ।

হায় করলেন কি ভাই……………………………………………………………………………………………

    শুধুমাত্র শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম…………….
    আপনাকে ধন্যবাদ

Level 0

আপনার লেখার ষ্টাইলটা ধারুন।পড়ার সময় মনেই হয়না যে পড়ছি।মনে হয় যেন ঘটনাটা আমাকে কেউ আবৃত্তি করে শুনাচ্ছে।
আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    সত্যি বলতে কি…এই জীবনী বিষয়ের টিউন গুলির পাঠক খুব কম থাকে…..
    আপনারা যে পড়ে মন্তব্য করলেন তাতে আমি খুব খুশি…………….শুভেচ্ছা রইল