
একবার ভাবুন তো, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং দামী একটি প্রাইভেট কোম্পানি হুট করে আপনার বাড়ির ঠিকানায় এসে হাজির হলো এবং আপনাকে জেরা করতে শুরু করল! শুনতে কোনো থ্রিলার সিনেমার দৃশ্য মনে হলেও, OpenAI-র সমালোচকদের জন্য এটাই এখন রূঢ় বাস্তব। তারা জানতে চাইছে তাদের প্রাক্তন কর্মীদের সাথে আপনি ঠিক কী কথা বলেছেন, কোন কোন ইনভেস্টর বা কংগ্রেসনাল অফিসের সাথে যোগাযোগ করেছেন।
আমরা আজ এমন এক সত্য নিয়ে আলোচনা করব যা হয়তো OpenAI-র গ্ল্যামারের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। কেন তারা সাধারণ মানুষের কথাকে এত ভয় পাচ্ছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তে। শুক্রবার ১৬ই জানুয়ারি ২০২৬-এ OpenAI একটি ‘বোমশেল’ বা আকস্মিক ঘোষণা দেয়। তারা ChatGPT-র ফ্রি ভার্সনে বিজ্ঞাপণ বা অ্যাডস টেস্ট করা শুরু করছে এবং সাথে ৮ ডলারের একটি নতুন সাবস্ক্রিপশন টিয়ার নিয়ে আসছে।
যেকোনো স্টার্টআপের জন্য এটি স্বাভাবিক মনে হলেও, OpenAI-র জন্য এটি আসলে একটি বড় পরাজয়ের স্বীকারোক্তি। খোদ Sam Altman ২০২৪ সালের অক্টোবরে বলেছিলেন যে, বিজ্ঞাপণ দেওয়া তাদের জন্য একটি ‘লাস্ট রিসোর্ট (Last Resort)’ বা শেষ উপায়। শত শত বিলিয়ন ডলার ইনভেস্টমেন্ট, Sora-র মতো প্রজেক্টে প্রতিদিন ১৫ মিলিয়ন ডলার লস এবং ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের বিশাল প্রতিশ্রুতির ভিড়ে কোম্পানিটি কি এখন সত্যিই খাদের কিনারে? পৃথিবীর ৪০% র্যাম (RAM) গ্রাস করা এবং নানা সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা তৈরি করা এই কোম্পানিটি কি ২০২৭ সালের মধ্যে দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে? সাবেক অ্যাসেট ম্যানেজার (Asset Manager) George Noble যেমনটা বলেছেন, "আমি কয়েক দশক ধরে কোম্পানিগুলোকে ধ্বংস হতে দেখেছি। এই কোম্পানিটির মধ্যেও সেই সমস্ত সতর্কবার্তা স্পষ্ট। "

এই টিউনটি মূল লক্ষ্য হলো OpenAI এবং তারা বর্তমানে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। Anthropic-এর Claude থেকে শুরু করে চীনা ওপেন-সোর্স (Open-source) মডেল—এআই জগত এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। OpenAI এখন আর আগের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী লিডার নয়।
মজার বিষয় হলো, Sam Altman একদিকে বলছেন আমাদের সাথে লড়াই করা অসম্ভব, আবার অন্যদিকে বলছেন প্রতিযোগীদের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা এমন অর্থ ব্যয় করে ফেলছে যা তাদের কাছে নেই। এক কোয়ার্টারেই ১২ বিলিয়ন ডলার লস, টানা এক বছর ধরে কমতে থাকা ট্রাফিক এবং Salesforce ও Apple-এর মতো পার্টনারদের হাতছাড়া হওয়া—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি মোটেও সুবিধার নয়। এমনকি Nvidia-র প্রধান Jensen Huang-ও এখন OpenAI-তে বড় ইনভেস্টমেন্টের প্রশ্নে বেশ কৌশলী উত্তর দিচ্ছেন। Microsoft-এর AI প্রধান Mustafa Suleyman তো সরাসরিই বলে দিয়েছেন যে তারা এখন এআই স্পেসে সেলফ-সাফিশিয়েন্ট হওয়ার লক্ষ্য রাখছে।
OpenAI-র এই মহাবিপদকে মূলত চারটি প্রধান অংশে ভাগ করা যায়:

ChatGPT-র জাদুকরী সক্ষমতা যেন হঠাৎ থমকে গেছে। Sam Altman একসময় ক্যান্সার নিরাময়ের স্বপ্ন দেখালেও, এখন তারা এআই সেক্স বটস বা Meme তৈরির প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত। কেন এমন স্থবিরতা? এর কারণ হলো স্কেলিং প্রবলেম (Scaling Problem)।
কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট Cal Newport-এর মতে, শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল যে এলএলএম (LLM)-কে যত বেশি ডেটা এবং কম্পিউট (Compute) দেওয়া হবে, সেটি তত বেশি বুদ্ধিমান হবে। ২০১৭ সালে Google-এর রিসার্চাররা যখন ট্রান্সফরমার আর্কিটেকচার (Transformer Architecture) আবিষ্কার করেন, তখন থেকেই এই জয়যাত্রা শুরু হয়। ২০২০ সালে OpenAI-র Jared Kaplan এবং Dario Amadei একটি রিসার্চ পেপারের মাধ্যমে দেখান যে মডেল যত বড় হবে, সেটি তত ভালো পারফর্ম করবে। এই স্কেলিং ল (Scaling Law)-এর ওপর ভিত্তি করেই GPT-3 কে ১৫ গুণ বড় করা হয়েছিল এবং এটি অবিশ্বাস্য সাফল্য পেয়েছিল।
সিলিকন ভ্যালিতে হইচই পড়ে গেল—সবাই ভাবল আমরা এজিআই (AGI)-র একদম কাছে চলে এসেছি। কিন্তু ২০২৪ সালের Summer-এ যখন তারা তাদের নতুন প্রজেক্ট Orion (GPT-5) ট্রেনিং দেওয়া শেষ করল, তখন দেখা গেল এটি ChatGPT 4-এর চেয়ে খুব একটা উন্নত নয়। অর্থাৎ, কেবল মডেল বড় করে আর বুদ্ধিমত্তা বাড়ানো যাচ্ছে না। একেই বলা হয় ডিমিনিশিং রিটার্নস (Diminishing Returns)। বিষয়টিকে এভাবে ভাবুন—একটি শিশু হামাগুড়ি থেকে হাঁটতে শিখেছে বলে সে ভবিষ্যতে উড়তে পারবে, এমনটা ভাবা যেমন বোকামি, এআই-র ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটছে। Cade Mets-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ৭৫% গবেষক মনে করেন বর্তমান টেকনিক দিয়ে এজিআই (AGI) পাওয়া সম্ভব নয়।
একটি মজার উদাহরণ দেওয়া যাক। ChatGPT-কে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, "১০০ মিটার দূরের কার ওয়াশে গাড়ি ধুতে হলে কি হেঁটে যাব নাকি গাড়ি চালিয়ে?" সে উত্তর দেয়, "হেঁটে যাওয়া ভালো। " কিন্তু গাড়িটি যদি বাড়িতেই রয়ে যায়, তবে সেটি ধোয়া হবে কীভাবে? এই সাধারণ লজিক্যাল ভুলের অর্থ হলো, এআই-র কাছে এখনও জগত সম্পর্কে কোনো বাস্তব ধারণা বা ওয়ার্ল্ড মডেল নেই।

এক সময় OpenAI ছিল এআই জগতের সম্রাট, কিন্তু সেই সিংহাসন এখন টলমল। ChatGPT-র মার্কেট শেয়ার ৮৬% থেকে কমে ৬৫%-এ দাঁড়িয়েছে। মানুষ এখন ChatGPT-তে আগের চেয়ে কম সময় ব্যয় করছে। অন্যদিকে, Google কিন্তু দমে যায়নি। শুরুর দিকে কিছুটা হোঁচট খেলেও বর্তমানে Gemini-র মাধ্যমে তারা দারুণভাবে ফিরে এসেছে।
রিসার্চ এবং মাল্টিমোডাল (Multimodal) কাজের ক্ষেত্রে—যেমন ছবি দেখে তথ্য পাওয়া—Gemini এখন ChatGPT-র চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। এই কারণেই Apple-এর মতো টেক জায়ান্ট এখন OpenAI-র বদলে Gemini-র দিকে ঝুঁকছে। এছাড়া চীনা মডেল যেমন Kling AI এবং Qwen দ্রুত বাজার দখল করছে। Google-এর Project Genie তো প্রম্পট থেকেই আস্ত ভিডিও গেমের জগত তৈরি করে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে OpenAI এখন চতুর্মুখী আক্রমণের শিকার।

আর্থিক দিক থেকে OpenAI এখন এক মহাসংকটে। ২০২৬ সালে তাদের লসের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৯ সাল নাগাদ প্রফিট করার আগে তাদের প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার লস গুনতে হবে। অথচ তারা আগামী ৮ বছরে ডেটা সেন্টার (Data Center) ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরিতে ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে! তাদের বার্ষিক রিকারিং রেভিনিউ (Recurring Revenue) যেখানে মাত্র ১৩ বিলিয়ন ডলার, সেখানে Oracle-কে বছরে ৬০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার চুক্তি তারা কীভাবে সামলাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ইনভেস্টররা এখন এই ঝুঁকি নিতে ভয় পাচ্ছেন। Blue Owl Capital ইতিমধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের ডিল থেকে সরে এসেছে। অন্যদিকে, Google-এর মতো কোম্পানির ক্যাশ ফ্লো নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই। তারা ৯ মাসে ৮৬ বিলিয়ন ডলার প্রফিট করছে। OpenAI-কে এখন টিকে থাকার জন্য ইনভেস্টরদের কাছে ‘চিৎকার’ করতে হচ্ছে। এছাড়া Johnny Ive-এর সাথে হার্ডওয়্যার ডিভাইস তৈরির প্রজেক্টটিও বর্তমানে খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো OpenAI-র সিইও Sam Altman-এর বিশ্বাসযোগ্যতা। তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে:
OpenAI শুরু হয়েছিল একটি নন-প্রফিট (Non-profit) হিসেবে যা মানবতার কল্যাণে কাজ করবে। কিন্তু আজ এটি কেবল ভ্যালুয়েশন (Valuation) বাড়ানোর নেশায় মত্ত একটি ফর-প্রফিট (For-profit) কোম্পানি।
২০১৫ সালে মানবতার উপকারের ব্রত নিয়ে যাত্রা শুরু করা OpenAI আজ ১ ট্রিলিয়ন ডলারের এক জুয়া খেলায় মেতেছে। ১ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেও যদি টেকনিক্যাল সীমাবদ্ধতা বা স্কেলিং প্রবলেম (Scaling Problem) সমাধান না হয়, তবে এই ইনভেস্টমেন্ট কোনো কাজে আসবে না। এআই যদি শেষ পর্যন্ত একটি সাধারণ কমোডিটি (Commodity) বা পণ্যে পরিণত হয়, তবে OpenAI-র এই বিশাল কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।
আপনি কি মনে করেন OpenAI এই মহাবিপদ কাটিয়ে উঠতে পারবে? নাকি গুগল এবং অন্যান্য প্রতিযোগীরা তাদের গ্রাস করে ফেলবে? আপনার মতামত টিউমেন্টে জানান।
আমি সোহানুর রহমান। সুপ্রিম টিউনার, টেকটিউনস, ঢাকা। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 12 বছর 5 মাস যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 681 টি টিউন ও 200 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 124 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।
কখনো কখনো প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর মত ঘটনা পুরো পৃথিবী বদলে দিতে পারে।