
একটু ভাবুন তো, আপনি আর আপনার বন্ধু একই সময়ে, একই জায়গা থেকে একই গন্তব্যে যাওয়ার জন্য Uber অ্যাপ খুললেন। কিন্তু দেখা গেল আপনার স্ক্রিনে ভাড়া দেখাচ্ছে ৫০০ টাকা, আর আপনার বন্ধুর ফোনে দেখাচ্ছে ৪৫০ টাকা। কিংবা অনলাইনে একটি শার্ট পছন্দ করলেন, যার দাম আপনার জন্য একরকম কিন্তু আপনার পাশের বাসার মানুষটির জন্য অন্যরকম। এমনটা কি আপনার সাথে কখনো হয়েছে?
যদি হয়ে থাকে, তবে জেনে রাখুন এটি কোনো ভুল বা কারিগরি ত্রুটি নয়। বরং এটি হলো Corporate Greed বা কর্পোরেট লোভের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে বড় বড় Companies গুলো উন্নত AI ব্যবহার করে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছে এবং আমাদের ব্যক্তিগত প্রোফাইল অনুযায়ী আলাদা আলাদা দাম বা Personalized Prices নির্ধারণ করছে। আজকের এই বিস্তারিত টিউনে উন্মোচন করব কীভাবে এই Surveillance Pricing আমাদের পকেট খালি করছে এবং কেন সবকিছু দিন দিন এত ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, Surveillance Pricing হলো এমন এক প্রযুক্তি যেখানে একটি Company আপনার ব্যক্তিগত তথ্য—যেমন আপনার কেনাকাটার অভ্যাস, আপনার এলাকায় বসবাসের ধরন বা আপনার Demographics—বিশ্লেষণ করে ঠিক করে যে আপনার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হবে।

এই ব্যবস্থার শুরু কিন্তু খুব একটা নতুন নয়। এটি ১৯৭০-এর দশকে US Airline Industry-র হাত ধরে শুরু হয়েছিল। তখন বিমানের টিকিটের দাম Federal Government নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু ১৯৭৮ সালে President Carter যখন Airline Deregulation Act-এ স্বাক্ষর করেন, তখন চিত্র পুরো বদলে যায়।
Airlines গুলো তাদের টিকিটের দাম বা Fares নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা বা Freedom পায়। এখান থেকেই তৈরি হয় প্রথম Yield Management Systems। American Airlines তখন Dynamo নামক একটি Pioneering Model তৈরি করে যা Demand Patterns বিশ্লেষণ করত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিমানের সিটের দাম কমিয়ে বা বাড়িয়ে দিত। ১৯৮৫ সালের মধ্যে কোম্পানিটি শুধুমাত্র এই কৌশলের কারণে ৬ থেকে ৮% Revenue Increases রিপোর্ট করে। এই মডেলের মূল মন্ত্র ছিল—প্লেন যত দ্রুত ভরবে, দাম তত বাড়বে; যাত্রার তারিখের যত কাছে টিকিট কাটবেন, ভাড়া তত বেশি হবে; আর সিট খালি থাকলে তবেই Discounts দেওয়া হবে।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই পদ্ধতিটি শুধু বিমানে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি Hotel Sector, Car Rentals এবং Rail Transport Service-এও ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৭ সালের দিকে Hilton হোটেল চেইন প্রথম পদ্ধতিগতভাবে এই Dynamic Pricing Model গ্রহণ করে। তারা একটি Centralized Rate Setting System ব্যবহার শুরু করে যা Real-Time-এ সব তথ্য বিশ্লেষণ করত।
এর ফলে Hilton টানা তিন বছর তাদের Revenue Per Available Room ৬% হারে বাড়াতে সক্ষম হয়। এমনকি Los Angeles, Chicago এবং New York-এর মতো ব্যস্ত শহরগুলোতে তাদের খালি রুমের সংখ্যা (Empty Nights) প্রায় ১২% কমে যায়। নিয়মটি ছিল সরাসরি—যদি কোনো উইকেন্ডে ৭০% রুম বুক হয়ে যায়, তবে দাম সাথে সাথে বেড়ে যাবে। আর বুকিং কম থাকলে Temporary Discounts চালু হবে।

ই-কমার্সের যুগে এই প্রথাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় Amazon। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে তারা গ্রাহকের Browsing Data, Search History এবং User Behavior দেখে দামের ভিন্নতা তৈরির পরীক্ষা শুরু করে। ২০০০ সালে একটি ঘটনা জানাজানি হয় যেখানে দেখা যায়, একই DVD একজন গ্রাহকের কাছে ৬% বেশি Markup-এ বিক্রি করা হচ্ছে।
যদিও Amazon একে Controlled Tests বলে দাবি করেছিল, কিন্তু এটি একটি বড় সত্য উন্মোচন করে—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ক্রেতাকে না জানিয়েই Automatically, Individually এবং Silently দাম বদলানো সম্ভব। ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে Cookies, IP Location এবং Purchase Frequency ট্র্যাকিং করার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এখন Algorithms ঠিক করে দেয় প্রতিটি গ্রাহকের কেনাকাটা করার সম্ভাবনা বা Estimated Conversion Probability কতটুকু। আজ শুধু শপিং নয়, Theme Parks, Restaurants, Retail Outlets এমনকি Rock Concerts-এও এই Surge Pricing জেঁকে বসেছে।

২০১২ সালে Uber এই ব্যবস্থার নাম দেয় Surge Pricing। তাদের Algorithm বিভিন্ন Variables যেমন—Available Drivers, লোকাল ইভেন্ট, Weather Conditions এবং Time of Day বিশ্লেষণ করে দাম বাড়িয়ে দেয়। কখনো কখনো দাম ২০০% পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে John F. Kennedy Airport থেকে Midtown Manhattan পর্যন্ত যে রাইড ছিল ৫০ ডলার, বর্তমানে সেই একই ট্রিপের জন্য আপনাকে ৭৫ ডলার গুনতে হতে পারে। অবাক করা তথ্য হলো, ভাড়া বাড়লেও Driver Earnings কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেখা গেছে, Uber's Take Rate ৩২% থেকে বেড়ে ৪২% হয়েছে। অর্থাৎ, আপনার পকেট থেকে কাটা বাড়তি টাকার সিংহভাগই কোম্পানির প্রফিটে জমা হচ্ছে।

২০২০ সালের পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। Delta Airlines-এর মতো কোম্পানিগুলো এখন Advanced Artificial Intelligence ব্যবহার করছে শুধু চাহিদা বোঝার জন্য নয়, বরং আপনি কত টাকা দিতে পারবেন তা অনুমান করার জন্য।
এই নতুন Algorithms একই সাথে লক্ষ লক্ষ Data Points বিশ্লেষণ করতে পারে। AI এখন আপনার ইতিহাস, আপনার Geographic Location, আপনি কতবার একই জিনিস সার্চ করেছেন, এমনকি কতক্ষণ আপনি একটি পণ্য আপনার শপিং Cart-এ ফেলে রেখেছেন—সবই জানে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা iPhone বা Apple Devices ব্যবহার করেন, তাদের জন্য দাম প্রায় ১৫% বেশি দেখানো হয়। কারণ কোম্পানিগুলো মনে করে আপনার Purchasing Power বা ক্রয়ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি। সহজ কথায়, আপনার দামী ফোনটি আপনার জন্যই বাড়তি খরচের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সবচেয়ে বিতর্কিত উন্নয়নটি ঘটেছে ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে Digital Supermarkets এবং Grocery Delivery Apps-এর মাধ্যমে। Instacart-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের AI Tools ব্যবহারের ফলে একই জিনিসের দাম একেক গ্রাহকের জন্য ২৩% পর্যন্ত আলাদা হতে পারে।
এখন এই প্রযুক্তি আপনার পাড়ার সুপারমার্কেটগুলোতেও চলে আসছে। Walmart এবং Kroger-এর মতো Major Chains-রা প্রথাগত কাগজের ট্যাগের বদলে Digital Shelf Labels বা ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার শুরু করছে। Walmart ঘোষণা করেছে ২০২৬ সালের মধ্যে তারা তাদের ২, ৩০০টি দোকানে এই প্রযুক্তি চালু করবে। এই Electronic Price Tags-এর সাহায্যে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো দোকানের হাজার হাজার জিনিসের দাম বদলে ফেলা যাবে। অর্থাৎ, দোকানের ভিড় বা আপনার চেহারা দেখে কোম্পানিগুলো চাইলে এক সেকেন্ডের মধ্যে জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিতে পারবে।

কোম্পানিগুলো এই ব্যবস্থাকে Efficiency এবং Optimization বলে দাবি করলেও এর পেছনে থাকা Ethical Concerns বা নৈতিক সংকটগুলো খুবই গভীর। এর ফলে যারা একটু সচ্ছল এলাকায় (Affluent Neighborhood) বাস করেন বা ভালো ডিভাইস ব্যবহার করেন, তাদের ওপর এক ধরনের 'ডিজিটাল ট্যাক্স' বসানো হচ্ছে। এমনকি আপনার অ্যাপ ব্যবহারের ধরন যদি আপনার আবেগপ্রবণ কেনাকাটার স্বভাব (Impulsive Buying Habits) প্রকাশ করে, তবে আপনাকেও বেশি টাকা গুনতে হবে।
পরিশেষে, দাম বা Price এখন আর শুধু পণ্যের মূল্যের ওপর নির্ভর করে না; এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে Individual Segmentation-এর একটি হাতিয়ার। এর মাধ্যমে সমাজে Economic Inequalities বা অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হচ্ছে। পণ্যের দাম এখন ক্রেতারপরিচয় দেখে নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা আমাদের সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ।
আপনার মতামত অনেক দামী। এই AI Based Pricing সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন? আপনার সাথে কি কখনো এমনটা ঘটেছে যেখানে আপনি অন্যের চেয়ে বেশি দাম দিয়েছেন? টিউমেন্ট-এ জানান এবং এই ধরনের আরও ইন-ডেপথ আলোচনার জন্য টেকটিউনসের সাথেই থাকুন।
আমি সোহানুর রহমান। সুপ্রিম টিউনার, টেকটিউনস, ঢাকা। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 12 বছর 3 মাস যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 676 টি টিউন ও 200 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 124 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।
কখনো কখনো প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর মত ঘটনা পুরো পৃথিবী বদলে দিতে পারে।