অ্যান্ড্রয়েড ফোনে RAM Cleaner ও Battery Saver অ্যাপ আসলে কী করে, মেমোরি ম্যানেজমেন্টের ভেতরের আসল বিজ্ঞান

ফোন একটু স্লো হলেই আমরা অনেকে Play Store খুলে RAM Cleaner, Speed Booster বা Battery Saver জাতীয় অ্যাপ ইনস্টল করে ফেলি। অ্যাপটি খুলে বড় একটা বাটনে চাপ দিলে স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, ৭৪২ MB RAM ফ্রি হয়েছে, ফোন এখন আগের চেয়ে দ্রুত। মনটা বেশ শান্তি পায়। কিন্তু মিনিট দুয়েক পরেই দেখা যায় RAM আবার আগের জায়গায় ফিরে গেছে।

প্রশ্নটা ঠিক এখানেই। এই অ্যাপগুলো আসলে ভেতরে কী করছে? অ্যান্ড্রয়েড কীভাবে মেমোরি সামলায় সেটা একবার বুঝে ফেললে এই বাটনের পুরো রহস্য পরিষ্কার হয়ে যায়। আজকের টিউনে আমি সেই বিষয়টিই ধাপে ধাপে সহজ ভাষায় সাজিয়ে বলার চেষ্টা করব।

খালি RAM মানেই ভালো ফোন নয়

কম্পিউটিং জগতে একটি বহু পুরোনো নীতি আছে, Free RAM Is Wasted RAM। অর্থাৎ RAM যদি ফাঁকা পড়ে থাকে তবে সেই মেমোরি দিয়ে কোনো কাজ হচ্ছে না, ফলে সেটি অপচয়। RAM কেনা হয় ব্যবহার করার জন্য, ফাঁকা রাখার জন্য নয়।

অ্যান্ড্রয়েড তৈরি হয়েছে Linux Kernel এর ওপর। এই কারণে অ্যান্ড্রয়েডের মেমোরি ব্যবস্থাপনা অনেকটা ডেস্কটপ অপারেটিং সিস্টেমের মতোই আগ্রাসী। আপনি যে অ্যাপটি একবার খুলেছেন, সেটি বন্ধ করার পরেও তার কোড ও ডেটার একটি অংশ RAM এ ক্যাশ হিসেবে জমা থাকে।

  • অ্যাপ আবার খুললে সেটি Storage থেকে নতুন করে পড়তে হয় না
  • RAM এ জমা থাকা অংশ থেকেই অ্যাপ চোখের পলকে সামনে চলে আসে
  • Processor কে কম কাজ করতে হয়, তাই বিদ্যুৎ খরচও কম হয়

এই জমা থাকা অ্যাপগুলো কিন্তু সক্রিয়ভাবে চলছে না। এগুলো Cached অবস্থায় থাকে, CPU সময় নেয় না, ব্যাটারিও খায় না। শুধু মেমোরিতে জায়গা দখল করে রাখে, যেন প্রয়োজনে সাথে সাথে জেগে উঠতে পারে।

Low Memory Killer এর ভূমিকা

এখন প্রশ্ন আসে, RAM ভরে গেলে কী হয়? অ্যান্ড্রয়েডে Low Memory Killer নামের একটি ব্যবস্থা কাজ করে। এটি প্রতিটি চলমান প্রসেসকে একটি গুরুত্বের স্কোর দিয়ে সাজিয়ে রাখে। মেমোরির চাপ বাড়তে শুরু করলে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রসেসটি নিজে থেকেই সরিয়ে দেয়।

গুরুত্বের ধাপগুলো মোটামুটি এমন

  • Foreground, আপনি এই মুহূর্তে যে অ্যাপটি স্ক্রিনে দেখছেন
  • Visible, স্ক্রিনে আংশিক দেখা যাচ্ছে এমন অ্যাপ
  • Service, ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজানো বা ফাইল ডাউনলোডের মতো কাজ
  • Cached, বন্ধ করা কিন্তু মেমোরিতে জমা থাকা অ্যাপ

নতুন অ্যাপ খোলার জন্য জায়গা দরকার হলে সিস্টেম সবার আগে Cached তালিকার নিচের দিকের অ্যাপটি ছেড়ে দেয়। কাজটি ঘটে মিলিসেকেন্ডের মধ্যে এবং আপনি কিছুই টের পান না। অর্থাৎ মেমোরি খালি করার জন্য বাইরের কোনো অ্যাপের সাহায্য অ্যান্ড্রয়েডের দরকার নেই, এই কাজটি অপারেটিং সিস্টেম নিজেই আপনার চেয়ে ভালো বোঝে।

বুস্ট বাটনে চাপ দিলে ভেতরে যা ঘটে

RAM Cleaner অ্যাপ কোনো জাদু জানে না। এটি মূলত একের পর এক ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেস বন্ধ করার অনুরোধ পাঠায়। ফলাফল হিসেবে যা হয়।

  • মেমোরিতে সাজানো ক্যাশ ভেঙে যায় এবং সংখ্যাটি কমে দেখায়
  • পরে ওই অ্যাপ খুললে সেটি একেবারে শূন্য থেকে লোড হয়, একে বলা হয় Cold Start
  • Cold Start এ Storage থেকে অনেক বেশি ডেটা পড়তে হয় এবং CPU কে বেশি খাটতে হয়
  • বেশি খাটা মানেই বেশি বিদ্যুৎ খরচ এবং ফোন কিছুটা গরম হওয়া

এর সাথে যোগ হয় আরেকটি সমস্যা। Messenger বা Email এর মতো অ্যাপগুলো নিজেদের সার্ভিস জোর করে বন্ধ হয়ে গেলে কিছুক্ষণ পর আবার নিজেরাই চালু হয়ে যায়। ফলে একটি চক্র তৈরি হয়, বন্ধ করা হচ্ছে আর আবার চালু হচ্ছে। এই বারবার চালু হওয়ার প্রক্রিয়াটি ব্যাটারির জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর।

Battery Saver অ্যাপ নিয়ে যে কথাটি বলা হয় না

অ্যান্ড্রয়েড ৬ থেকে সিস্টেমের ভেতরেই Doze Mode এবং App Standby যুক্ত হয়েছে। ফোন কিছুক্ষণ নিশ্চল পড়ে থাকলে সিস্টেম নিজেই ব্যাকগ্রাউন্ডের কাজ, Network Access এবং Sync একসাথে জমিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর চালায়। পরের সংস্করণগুলোতে Background Execution Limit এবং Adaptive Battery যোগ হয়ে এই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়েছে।

Play Store থেকে নামানো একটি সাধারণ অ্যাপের হাতে সিস্টেম লেভেলের এই ক্ষমতা থাকে না। তাই ব্যাটারি বাঁচানোর জন্য তার হাতে বাস্তবে খুব কম উপায় থাকে। উল্টো দিকটি হলো, অ্যাপটি নিজেই ব্যাকগ্রাউন্ডে জেগে থাকে, নিয়মিত বিজ্ঞাপণ লোড করে এবং Notification পাঠায়। অর্থাৎ যে সমস্যার সমাধান করতে অ্যাপটি এসেছে, সে নিজেই সেই সমস্যার একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

ফোন সত্যিই স্লো হলে কী করবেন

ফোন ধীর হওয়ার পেছনে RAM এর চেয়ে অন্য কারণগুলো অনেক বেশি দায়ী। নিচের কাজগুলো কোনো বাড়তি অ্যাপ ছাড়াই বাস্তব ফল দেয়।

  • Internal Storage এর অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ফাঁকা রাখুন, কারণ Flash Storage প্রায় ভরে গেলে লেখার গতি লক্ষণীয়ভাবে কমে যায়
  • যে অ্যাপগুলো মাসে একবারও খোলেন না সেগুলো Uninstall করে দিন
  • অ্যাপ ও সিস্টেম আপডেট সময়মতো দিন, কারণ আপডেটে পারফরম্যান্স ও মেমোরি লিকের সমাধান আসে
  • Developer Options এ গিয়ে Animation Scale কমিয়ে দিলে ফোন অনেক বেশি সাড়া দেয় বলে মনে হয়
  • হোম স্ক্রিনে অতিরিক্ত Widget এবং Live Wallpaper কমিয়ে ফেলুন
  • যে অ্যাপ বেশি ভারী মনে হয় তার হালকা সংস্করণ বা সরাসরি ব্রাউজার ব্যবহার করে দেখুন
  • সব চেস্টার পরেও সমস্যা থাকলে ব্যাকআপ নিয়ে Factory Reset করা সবচেয়ে কাজের সমাধান

তাহলে কি কখনোই অ্যাপ বন্ধ করা যাবে না

অবশ্যই যাবে। কোনো নির্দিষ্ট অ্যাপ আটকে গেলে, ঠিকমতো সাড়া না দিলে বা অস্বাভাবিক ব্যাটারি খরচ দেখালে Settings থেকে সেটির Force Stop করা যুক্তিসঙ্গত। এখানে পার্থক্যটি হলো, আপনি একটি নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান করছেন, ঢালাওভাবে সব অ্যাপকে মেমোরি থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন না।

ভারী কোনো গেম খেলার ঠিক আগে Recents থেকে বড় অ্যাপগুলো সরিয়ে দিলেও কিছুটা সুবিধা মেলে, বিশেষ করে কম RAM এর ফোনে। তবে এটি প্রতি ঘণ্টায় করার মতো অভ্যাস নয়।

শেষ কথা

RAM ক্লিনার অ্যাপের বড় বাটনটি আসলে একটি মনস্তাত্ত্বিক সমাধান। সংখ্যা কমতে দেখলে মনে হয় কাজ হয়েছে, অথচ বাস্তবে ফোনকে বাড়তি পরিশ্রম করানো হয়েছে। অ্যান্ড্রয়েড বছরের পর বছর ধরে নিজের মেমোরি ব্যবস্থাপনাকে যতটা উন্নত করেছে, তাতে এই ধরনের অ্যাপের প্রয়োজনীয়তা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

আপনার ফোনকে সবচেয়ে বড় উপকার করবেন যদি স্টোরেজ ফাঁকা রাখেন, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ সরিয়ে দেন এবং সিস্টেমকে তার নিজের কাজ করতে দেন। টিউনটি ভালো লেগেছে কি না, আর আপনি নিজে কখনো এমন অ্যাপ ব্যবহার করে ঠকেছেন কি না, টিউমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।

Level 0

আমি নাছিরুল হক। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 7 ঘন্টা 40 মিনিট যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 2 টি টিউন ও 0 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 0 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।


টিউনস


আরও টিউনস


টিউনারের আরও টিউনস


টিউমেন্টস